¦
নজরুল এবং ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে

শামস আরেফিন | প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৫

উপমহাদেশে মুসলিম সাম্যাজ্যের সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ব্রিটিশ শাসনামলের যাত্রা। কার্যত এরপরই মুসলমান অভিজাতের সঙ্গে ব্রিটিশদের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। অভিমানে মুসলমানরা ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে আঁধারে থাকাকেই শ্রেয় মনে করে। এ সময় সংস্কৃতি বলতে কুসংস্কার বা ধর্মান্ধতা ছিল একমাত্র সম্বল। অন্যদিকে হিন্দু জমিদারদের ব্রিটিশরাজের সঙ্গে সখ্য মুসলমান প্রজাদের ওপর নিপীড়নের বৈধতা দান করে। এ নির্যাতিতদের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো ছিল না কোনো প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, না ছিল কোনো সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এ সময়ে সমাজ সংস্কারক স্যার সৈয়দ আহমদ, সৈয়দ আমীর আলীসহ ও ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের অবদান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সাংস্কৃতির শক্তিশালী হাতিয়ার কবিতা ও গানে যাদের সরব উপস্থিতি বাঙালি অস্তিত্বের বীজ রক্ষায় প্রধান ভূমিকা রেখেছে বলা যায়, তাদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাস উদ্দীন উল্লেখযেগ্যা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় নজরুল হয়তো মুসলমানদের মতো আলাদা দেশ চাননি। বরং তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, মহাত্মাগান্ধীর মতো একটি অখণ্ড ভারত চেয়েছিলেন। কিন্তু সর্বত্র অধঃপতিত মুসলমানদের সম্মানজনক অস্তিত্ব রক্ষার প্রচেষ্টা তার গানে দৃশ্যমান। কখনও এ বিপ্লব বোঝাতে মুসলিম শাসকদের সবুজ পতাকার রং পাল্টে দিয়ে লাল রঙের পতাকায় বিপ্লবের অপরিহার্যতা বুঝিয়েছেন। আর গানে-গজলে কামাল আতাতুর্কের পতাকা, ইরানের রেজা পাহলবির উত্থান ও মিসরের মহাবীর জগলুলের উদাহরণ দিয়ে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। এভাবে নজরুলের যে ৬০টি গজল আব্বাসউদ্দীন গান, তার মধ্যে ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে একটি। অসংখ্য জলসায় যখন এ গানগুলো নজরুল, আব্বাসউদ্দীন ও আসাদ উদ্দোলাহ সিরাজি গাইত, তা একবার শুনে শ্রোতারা তুষ্ট হতো না। একই গজল বারবার গাইতে হতো। এর মধ্যেই একটি অনত্যম শ্রেষ্ঠ গজল ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। অনেকেই মনে করেন এটা হঠাৎ করে নজরুল লিখে ফেলেন। কিন্তু আধ্যাত্মিক চর্চা ও সুফিবাদের পেয়ালায় ধারবাহিক চুমুক দেয়ার কারণেই এ গান রচনা করা সম্ভব। যে বেদনা বা স্বজাতির প্রতি দরদের তাড়নায় তিনি এ গজল রচনা করেছেন তার পটভূমি অনেকটা রোমাঞ্চিত হওয়ার মতো।
ঈদুল ফিতরকে নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কালজয়ী এ গান রচনা করেন ১৯৩১ সালে। লেখার মাত্র চারদিন পর শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের গলায় গানটি রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড করার দুই মাস পর ঈদের ঠিক আগে আগে এই রেকর্ড প্রকাশ করা হয়। কীভাবে এ গজলটি রচিত হল তা শোনা যাক আব্বাসউদ্দীনের ‘দিনলিপি ও আমার শিল্পী জীবনের কথা’র ১৩৩ নম্বর পৃষ্ঠায়। আব্বাসউদ্দীন বলেন, ‘কাজীদার লেখা গান ইতোমধ্যে অনেকগুলো রেকর্ড করে ফেললাম। তার লেখা ‘ বেণুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধুর’, ‘অনেক কিছু বলার যদি দুদিন আগে আসতে’, ‘গাঙে জোয়ার এল ফিরে তুমি এলে কই’, ‘বন্ধু আজও মনে পড়ে আম কুড়ানো খেলা’ ইত্যাদি রেকর্ড করলাম। একদিন কাজীদাকে বললাম, ‘কাজীদা, একটা কথা মনে হয়। এই যে পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল- এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়। এ ধরনের বাংলায় ইসলামি গান দিলে হয় না? তারপর আপনি তো জানেন কীভাবে কাফের-কুফর ইত্যাদি বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে অপাঙ্ক্তেয় করে রাখার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে এক দল ধর্মান্ধ! আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান’।
কথাটা তার মনে লাগল। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, তুমি ভগবতীবাবুকে বলে তার মত নাও। আমি ঠিক বলতে পারব না’। আমি ভগবতী ভট্টাচার্য অর্থাৎ গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইনচার্জকে বললাম। তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘না না না, ওসব গান চলবে না। ও হতে পারে না’। মনের দুঃখ মনেই চেপে গেলাম। এর প্রায় ছয় মাস পর। একদিন দুপুরে বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি অফিস থেকে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ঘরে গিয়েছি। দেখি, একটা ঘরে আশ্চর্যময়ী আর ভগবতীবাবু বেশ রসালো গল্প করছেন। আমি নমস্কার দিতেই বললেন, ‘বসুন, বসুন’। আমি তার রসাপ্লুত মুখের দিকে চেয়ে ভাবলাম, এ-ই উত্তম সুযোগ। বললাম, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে বলি। সেই যে বলেছিলাম ইসলামি গান দেওয়ার কথা। আচ্ছা; একটা এক্সপেরিমেন্টই করুন না, যদি বিক্রি না হয় আর নেবেন না, ক্ষতি কী’? তিনি হেসে বললেন, ‘নেহাতই নাছোড়বান্দা আপনি, আচ্ছা আচ্ছা, করা যাবে’।
শুনলাম, পাশের ঘরে কাজীদা আছেন। আমি কাজীদাকে বললাম, ভগবতীবাবু রাজি হয়েছেন। তখন সেখানে ইন্দুবালা কাজীদার কাছে গান শিখছিলেন। কাজীদা বলে উঠলেন, ‘ইন্দু, তুমি বাড়ি যাও, আব্বাসের সঙ্গে কাজ আছে’। ইন্দুবালা চলে গেলেন। এক ঠোঙা পান আর চা আনতে বললাম দশরথকে। তারপর দরজা বন্ধ করে আধঘণ্টার ভেতরই লিখে ফেললেন, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’। তখনই সুর সংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন। পরের দিন ঠিক এই সময় আসতে বললেন। পরের দিন লিখলেন, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর’। গান দু’খানা লেখার ঠিক চার দিন পরই রেকর্ড করা হল। কাজীদার আর ধৈর্য মানছিল না। তার চোখেমুখে কী আনন্দই যে খেলে যাচ্ছিল! তখনকার দিনে যন্ত্র ব্যবহার হতো শুধু হারমোনিয়াম আর তবলা। গান দু’খানা আমার তখন মুখস্থ হয়নি। তিনি নিজে যা লিখে দিয়েছিলেন, মাইকের পাশ দিয়ে হারমোনিয়ামের ওপর ঠিক আমার চোখ বরাবর হাত দিয়ে কাজীদা নিজেই সেই কাগজখানা ধরলেন, আমি গেয়ে চললাম। এই হল আমার প্রথম ইসলামি রেকর্ড। শুনলাম; দুই মাস পর ঈদুল ফিতররের সময় গান দু’খানা তখন বাজারে বের হবে। ঈদের বাজার করতে একদিন ধর্মতলার দিকে গিয়েছি। বিএন সেন অর্থাৎ সেনোলা রেকর্ড কোম্পানির বিভূতিদার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, আমার দোকানে এস’। তিনি এক ফটোগ্রাফার ডেকে নিয়ে এসে বসলেন, ‘এর ফটোটা নিন তো’। আমি তো অবাক! বললাম, ‘ব্যাপার কী’? তিনি বললেন, ‘তোমার একটা ফটো নিচ্ছি, ব্যস, আবার কী’?
ঈদের বন্ধে বাড়ি গেলাম।...কলকাতা ফিরে এসে ট্রামে চড়ে অফিসে যাচ্ছি। ট্রামে একটি যুবক আমার পাশে গুনগুন করে গাইছে, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আমি একটু অবাক হলাম। এ গান কী করে শুনল! অফিস ছুটির পর গড়ের মাঠে বেড়াতে গিয়েছি, মাঠে বসে একদল ছেলের মাঝে একটি ছেলে গেয়ে উঠল, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আনন্দে-খুশিতে মন ভরে উঠল।... ছুটলাম কাজীদার বাড়ি। শুনলাম, তিনি রিহার্সেল রুমে গেছেন। দেখি, দাবা খেলায় তিনি মত্ত। দাবা খেলতে বসলে দুনিয়া ভুলে যান তিনি। আমার গলার স্বর শুনে একদম লাফিয়ে উঠে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আব্বাস, তোমার গান কী যে-’ আর বলতে দিলাম না পা ছুঁয়ে তার কদমবুসি করলাম। ভগবতীবাবুকে বললাম, ‘তাহলে এক্সপেরিমেন্টের ধোপে টিকে গেছি, কেমন’? তিনি বললেন, ‘এবার তাহলে আরও ক’খানা এই ধরনের গান...’
নজরুলের এই গজলগুলোর শব্দচয়ন বিশেষ করে আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার বলে দেয়, তিনি কতটা আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন। যেমন ‘শহীদি ঈদগাহে দেখ আজ জামায়েত ভারী’। এই যে শহীদ শব্দ; যার অর্থ হচ্ছে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীনের পথে জীবন দান করা। তা কিন্তু সাধারণ অর্থে জীবন উৎসর্গকারী যে কোনো যোদ্ধাকে বলা যাবে না। শহীদ হওয়ার জন্য অবশ্যই দ্বীন রক্ষা অর্থাৎ ইসলাম ও মুসলিম ভাইয়ের জীবন রক্ষার্থে, মুসলিম দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে বা অন্য মুসলমানের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য জীবন দান করলেই তাকে শহীদ বলা যাবে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে কেউ মৃত্যুবরণ করলে বা জামাতে ইসলামের কারণে মৃত্যুবরণ করলে তাকে শহীদ বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। অথচ এ শহীদ ও স্বার্থরক্ষায় জীবনদাতার পার্থক্য বুঝাতে তিনি ‘শহীদি ঈদগাহে’ ইত্যাদি শব্দ দিয়ে আঘাত করেছেন। কেন এ ধরনের গান তার লেখার প্রয়োজন হল; তার উত্তর তিনি প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খান সাহেবকে এক চিঠিতে জানান এভাবে, ‘আপনি সমাজকে পতিত দয়ার পাত্র বলেছেন। আমিও সমাজকে পতিত নীতিহীন মনে করি। কিন্তু দয়ার পাত্র মনে করতে পারিনে। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি আমার সমাজকে মনেকরি ভয়ের পাত্র। এ-সমাজ সর্বদাই আছে লাঠি উঁচিয়ে; এর দোষ-ত্র“টির আলোচনা করতে গেলে নিজের মাথা নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়তে হয়। আপনি হয়তো হাসছেন, কিন্তু আমি তো জানি, আমার শির লক্ষ করে কত ইটপাটকেলই না নিক্ষিপ্ত হয়েছে।’
নজরুল বুঝতে পেরেছিলেন আত্মোপলব্ধির অভাবই মুসলামানের অধঃপতনের কারণ। যখন হীনস্বার্থে মুসলিম সমাজ ভাগ হল, তারা হল পৃথিবীর লাঞ্ছিত একটি জাতি। তাদের নিয়ন্ত্রণ নিল ঔপনিবেশিক শক্তি। আর যখনই মানুষ জ্ঞানের ছোঁয়া পায়, তখন সে বুঝতে পারে তার কী করা উচিত। জ্ঞান আত্মোউন্নয়ন ও মানবিকতার পথ দেখায়। আর মূল্যবোধ ও মানবিকতাই মানুষকে সততার পথ দেখায়। কতটা আধ্যাত্মিকতায় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, বুঝা যায় তার গজল, ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’ শুনে। তিনি এখানে কিন্তু বিশ্বাস শব্দটি ব্যবহার করেননি। কারণ ঈমান শব্দের অর্থ কোনো কিছুকে না দেখে বিশ্বাস করা। আর শুধু বিশ্বাস করার অর্থ দেখে কোনো কিছুর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। আর স্রষ্টার সেই অনুগত সৃষ্টি যদি পূর্ণ ঈমানের অধিকারী না হয়, তবে সে কি পরিপূর্ণ মুসলমান হতে পারে। ইসলাম সহানুভূতির ও সাম্যের ধর্ম। এ সহানুভূতি বা সাম্য শুধু নিজ ধর্মে বিশ্বাসীদের ওপর সীমাবদ্ধ নয়।
নজরুলের গজলের মধ্য দিয়ে বাংলা গানে পারস্যের গজল, তুরস্কের লোকগীতি, আরবি সুর, মিসরি সুর, কাওয়ালি, মুর্শিদি, জাগরনী গান ও কোরাস গান ইত্যাদি প্রবেশ। সর্বোপরি ঘুমন্ত বাঙালি মুসলমানের চেতনা উদ্বুদ্ধকারী, সুর ঐশ্বর্যে ভরপুর দু’শ-এর মতো অপূর্ব ইসলামি গান। বাংলায় এত সংখ্যক ইসলামি গান তার আগে আর কারও সৌভাগ্য হয়নি রচনা করার। সুরের প্রতি অসামান্য দখল ছিল তার। গজলও গানে ঘটিয়েছেন অসংখ্য রাগের সংমিশ্রণ। যেমন তার বাগেশ্রী ও পিলু রাগের সংমিশ্রণে সৃষ্ট অনবদ্য গজল ‘চেয়োনা সু-নয়না- আর চোয়েনা এ নয়ন পানে’। গজলের মতো ইসলামী গানেও রসূল, কলেমা, নামাজ, হজ, জাকাত, ঈদ, মহররম সংযুক্তকরণের পাশাপাশি মুসলিম বীর খালিদ, তারিক, মুসা, হজরত আলী, ওমর খাত্তাব থেকে শরু করে সুলতানা রাজিয়া ও তুরস্কের নারীজাগরণের অগ্রদূত খালিদা এদিকে তুলে আনলেন। তুলে আনলেন মুসলমান সমাজের অধঃপতনের চিত্র পূর্ববর্তী ইতিহাস ও ঐতিহ্য হারানোর কারণ। সমাজকে সচেতনতার চাবুকে আঘাত করে শিক্ষা দিতে চাইলেন। প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খানের কাছে লেখা এক চিঠিতে সমাজকে শিক্ষা দেয়ার বিষয়টি তুলে এনে তিনি জানান এই সমাজে, ‘বেদনা-সুন্দরে পূজা যারাই করেছেন, তাদের চিরকাল একদল লোক হুজুগে বলে নিন্দা করেছে। আর, এরা দলে ভারী। এরা মানুষের ক্রন্দনের মাঝেও সুর-তাল লয়ের এতটুকু ব্যতিক্রম দেখলে হল্লা করে- যে ও কান্না হাততালি দেয়ার মতো কান্না হল না বাপু, একটু আর্টিস্টিকভাবে নেচেনেচে কাঁদ। সব সমালোচনার ওপরে যে-বেদনা, তাকে নিয়ে হুইটম্যানের মতো ঋষিকেও অ-কবির দলে পড়তে হয়েছিল’। তারপরও বেদনার গান তিনি গেয়েছেন। সমাজকে জাগ্রত করার দায়িত্ব ও নিপীড়িতদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিল তার কবিতা। তাই এ চিঠির শেষাংশে তিনি বলেন, ‘এই বেদনার গান গেয়েই আমাদের সাহিত্য-স্রষ্টাদের জন্য নূতন সিংহাসন গড়ে তুলতে হবে। তারা যদি কালিদাস, ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি রূপ স্রষ্টাদের পাশে বসতে নাই পায়, পুশকিন, দস্তয়ভস্কি, হুইটম্যান, গর্কি, যোহান বোয়ারের পাশে ধূলির আসনে বসবার অধিকার তারা পাবেই। এ ধূলির আসনই একদিন সোনার সিংহাসনকে লজ্জা দেবে;...’।
এভাবে আধ্যাত্মিকতার ধারাবাহিকতায় তার লেখা গান- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ। ’ আমরা জানি- ফিতর শব্দের অর্থ ভাঙা। পুরো রমজান রোজার পর যে উপবাস ভঙ্গের যে আনন্দের দিন, তা-ই ঈদুল ফিতর। আর এ ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে এ গান তিনি রচনা করেন। এ গানে তিনি বলেছেন মুসলমানদের নিদ ভাঙাতে লেখা। ভাঙতে সম্পদও ব্যক্তি স্বার্থের মোহ। যে ব্যক্তির স্বার্থের কারণে মুসলমানদের এ অবনতি। কারণ এমন ঈদগাহে তার নামাজ পড়তে হবে আত্মশুদ্ধির জন্য, যে ঈদগাহে গাজী মুসলিম শহীদ হয়েছে। আবার তাকে ব্যথিত হতে হবে তাদের ব্যথায়, যারা আজীবিন উপোস কাটান খাবারের অভাবে। তাই এই আনন্দ শুধু নিজের মাঝে সীমাবদ্ধতায় উপভোগ বা আনন্দ করার জন্য নয়। হৃদয়ের তশতরিতে তৌহিদের শিরনি পরিবেশন করার জন্য সুফিবাদ পরিপূর্ণরূপে আধ্যাত্মিক হতে হবে তাকে। ভাবতে হবে বিশ্বমানবতার কথা। আব্বাসউদ্দীন আহমেদ তার দিনলিপিতে এ ব্যাপারে বলেন, ‘এই গান প্রকাশের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা প্রথম জানতে পারল, তাদের সত্যি সংস্কৃতি বলতে কিছু আছে। তারা ভাবল সাহিত্যে শত বছরের খরার পর এবার প্রকৃত কবির আবির্ভাব ঘটল’। আর এ আত্মবিশ্বাসটি যে কবি জাগিয়ে দিতে পেরেছিলেন, তিনি নজরুল ছাড়া আর কেউ নয়। সত্যি সুফিবাদের পেয়ালার সবার পান করা ছাড়া কি এমন সুন্দর রচনা করা যায়, ‘যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী/ সেই গরিব ইয়াতিম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ.../তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত হয়ে মনে উম্মীদ।/ ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’।
 

ঈদ বিশেষ সংখ্যা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close