¦
মুজাহিদের ফাঁসির রায়

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৩

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল বুধবার বেলা পৌনে ১টায় এ রায় ঘোষণা করেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর এ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিই প্রমাণ হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেন। এর বাইরে ৫ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং ৩ নম্বর অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে তাকে। ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগের বিষয়ে তাকে খালাস দিয়েছেন আদালত। এসব অভিযোগের সত্যতা থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ তা প্রমাণ করতে পারেনি। ১ নম্বর অভিযোগ ৬ নম্বরের অন্তর্ভুক্ত করে এর জন্য ট্রাইব্যুনাল আলাদা রায় দেননি।
৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, গণহত্যা, পাক বাহিনীকে সহায়তা, হত্যা, নির্যাতন ও দেশত্যাগে বাধ্য করায় সুপিরিয়র নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুজাহিদ। ৭ নম্বরে বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে। ১ নম্বর অভিযোগে বর্ণিত সাংবাদিক সিরাজ হত্যার বিষয়টি ৬ নম্বর অভিযোগে উল্লিখিত ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা’র অন্তর্ভুক্ত জানিয়ে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও এতে আলাদা করে তাকে কোনো সাজা দেননি ট্রাইব্যুনাল। ৫ নম্বর অভিযোগ সুরকার আলতাফ মাহমুদসহ কয়েকজনকে হত্যার নির্দেশ দেয়ার ঘটনায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। তবে এ রায়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, তার পরিবার, তার পক্ষের আইনজীবীরাসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা এর বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। রায় প্রত্যাখ্যান করে আজ সারাদেশে হরতাল ডেকেছে জামায়াত।
এর আগে সোমবার জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের আমির অধ্যাপক গোলাম আযমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৯০ বছরের জেল প্রদান করেন ট্রাইব্যুনাল। গোলাম আযমের রায় ঘোষণার পর যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিকারী বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের মধ্যে অসন্তুষ্টি দেখা দেয়। আবারও মাঠে নেমে আসে গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠন। এ অসন্তুষ্টির দুই দিনের মাথায় বুধবার মুজাহিদের রায় এনে দিয়েছে কিছুটা স্বস্তি। তবে জামায়াতের হরতালের কারণে সংঘাত-সংঘর্ষের আশংকায় রয়েছে দেশবাসী। বুধবার ১০টা ৪৮ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে বিচারপতিরা এজলাসে আসার পর চেয়ারম্যান সূচনা বক্তব্য শুরু করেন। এ সময় মুজাহিদ এজলাসের কাঠগড়ায় হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। ২০৯ পৃষ্ঠার মূল রায়ের সারাংশ ৩৭ পৃষ্ঠার প্রথম অংশ পড়া শুরু করেন বিচারপতি শাহিনূর ইসলাম। রায় পড়া শুরুর পর মুজাহিদ কাঠগড়ায় হাত ঠেকিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে মনোযোগ দিয়ে রায় শুনতে থাকেন। রায় পড়ার পুরো সময় তিনি কখনো হেলান দিয়ে, কখনো কনুইয়ে ভর দিয়ে, কখনো সামনের দিকে ঝুঁকে মনোযোগ দিয়ে রায় শোনেন। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ৭ নম্বর অভিযোগের রায় পড়ার সময় মুজাহিদ অনেকক্ষণ উপরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এ সময় তিনি কিছু একটা বলার চেষ্টা করেন বিচারপতিদের। কিন্তু ততক্ষণে সারাংশের তৃতীয় ও শেষ অংশ পড়া শুরু করে দেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। যে কারণে মুজাহিদ আর কিছু বলার সুযোগ পাননি। চূড়ান্ত রায় পড়া শুরু হলে তাকে বিচলিত ও উদ্বিগ্ন দেখায়। কাঠগড়ার ঠিক সামনের আসনে বসা ছিলেন তার ছেলে আলী আহমেদ তাজজীদ, আলী আহমেদ তাহকীক ও আলী। বেলা পৌনে ১টার দিকে রায় পড়া শেষ হয়। এর আগে মুজাহিদকে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
দুই অভিযোগে ফাঁসি : মুজাহিদের বিরুদ্ধে ৬ নম্বর অভিযোগে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটিতে থাকা নেতা হিসেবে গণহত্যা সংঘটিত করা, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা, হত্যা, নির্যাতন, দেশ ত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি এবং ৭ নম্বর অভিযোগে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ ও গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে এই দুই অভিযোগে তাকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এসব অভিযোগ প্রসিকিউশন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্র্রমাণিত ৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৭ মার্চের পর ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প তৈরি করে। পরে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারাও ওই স্থানে ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ অপরাধজনক নানা কর্যক্রম চালায়। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি হওয়ার সুবাদে আর্মি ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর সুপিরিয়র নেতা হিসেবে আর্মি ক্যাম্পে ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসারের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী নানা অপরাধের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করতেন। এ ধরনের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মুজাহিদ ১০ ডিসেম্বর থেকে পরিচালিত বুদ্ধিজীবী নিধন অভিযান, সারাদেশে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী বাহিনী পরিচালনা, হত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটিত করেন।
প্রমাণিত হওয়া ৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১৩ মে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নির্দেশে রাজাকার বাহিনী ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করেন। শান্তি কমিটির বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বকচর গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামলা চালিয়ে বীরেন্দ্র সাহা, উপেন সাহা, জগবন্ধু মিস্ত্রি, সত্য রঞ্জন দাশ, নিরদবন্ধু মিত্র, প্রফুল্ল মিত্র ও উপেন সাহাকে আটক করা হয়। উপেন সাহার স্ত্রী রাজাকারদের স্বর্ণ ও টাকা দিয়ে তার স্বামীর মুক্তি চান। রাজাকাররা সুনীল কুমার সাহার কন্যা ঝুমা রানীকে ধর্ষণ করে। পরে আটক হিন্দু নাগরিকদের গণহত্যা করে।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ছিল সাংবাদিক সিরাজ হত্যা। এ অভিযোগটি ৬ নম্বর অভিযোগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত শ্রেণীর উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল আলাদা কোনো সাজা দেননি। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছিল, একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর চামেলীবাগ থেকে সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে অপহরণ করা হয়। মুজাহিদের পরিচালনাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন ৭-৮ যুবক তাকে ধরে মিনিবাসে তুলে নেয়। আজ পর্যন্ত তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ওই সময় সিরাজ উদ্দিন হোসেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নিজ পত্রিকায় ভাষ্যকার পরিচয়ে ‘ঠগ বাছতে গা উজাড়’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এদেশীয় এজেন্টদের বাংলাদেশের নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর হয়রানির চিত্র তুলে ধরেন। ওই প্রবন্ধ প্রকাশের পর জামায়াতের দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে ‘অতএব ঠক বাছিও না’ শিরোনামে পাল্টা প্রবন্ধ ছাপা হয়। ওই প্রবন্ধে সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে সমালোচনা করা হয়।
পাঁচ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন : ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলে শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদসহ কয়েকজনকে হত্যার নির্দেশ দেয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫ম অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, হত্যার ঘটনার সময় আসামি উপস্থিত না থাকলেও তার নির্দেশেই নিরস্ত্র-নিরীহ ওই কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রমাণ করতে পেরেছেন ট্রাইব্যুনাল। ৫ নম্বর অভিযোগ ছিল, ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট রাত ৮টায় পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীসহ ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে তারা আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে দেখে তাদের গালাগাল করেন এবং পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন, প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আদেশের আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। আসামি মুজাহিদ অন্যদের সহায়তায় আটকদের একজনকে ছাড়া অন্য নিরীহ-নিরস্ত্র বন্দিদের অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ গুমের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন।
নির্যাতনের দায়ে আরও ৫ বছর : মুজাহিদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অন্য আটক-নির্যাতনের অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। প্রমাণিত ৩ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে একদিন ফরিদপুর শহরের খাবাসপুর মসজিদের সামনে থেকে রাজাকাররা কোতোয়ালি থানার গোয়ালচামট (রথখোলার) মৃত রমেশ চন্দ্র নাথের পুত্র রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে আটক করে। বেলা অনুমান ১১টার দিকে ফরিদপুর পুরনো সার্কিট হাউসে আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সামনে পাকিস্তানি সেনা অফিসার মেজর আকরাম কোরাইশীর কাছে হাজির করা হয় বাবু নাথকে। তখন মুজাহিদ ওই মেজরের সঙ্গে কথা বলার পর বাবু নাথের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। তার একটি দাঁত ভেঙে ফেলা হয়। নির্যাতনের পর মুজাহিদের ইশারায় তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বিহারি ক্যাম্পের উত্তর পাশে আবদুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে রাজাকাররা আটকে রাখে। পরে রাতে রণজিৎনাথ বাবু তার আটক ঘরের জানালার শিক বাঁকা করে ওই ঘর থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচান।
দুটিতে খালাস : প্রসিকিউশন ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি বলে রায়ে বলা হয়েছে। এ দুই অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন মুজাহিদ। অভিযোগ ২-এ বলা হয়, একাত্তরের মে মাসে একদিন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নেতৃত্বে ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন থানার বিভিন্ন গ্রামের ৩০০-৩৫০ বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। পরে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে ৫০-৬০ জন হিন্দু নরনারীকে হত্যা করা হয়। আর প্রমাণ করতে না পারা অভিযোগ ৪-এ বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৬ জুলাই সকালে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থেকে স্থানীয় রাজাকাররা মোঃ আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে আটক করে। এরপর পাখিকে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে রাখা হয়। আটক বন্দিদের মধ্যে আবু ইউসুফ পাখিকে দেখে মুজাহিদ পাকিস্তানি মেজরকে কিছু একটা বলার পরই তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। সেখানে ১ মাস ৩ দিন আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ নির্যাতনে আবু ইউসুফ পাখির বুকের ও পিঠের হাড় ভেঙে যায়।
রায়ের পর্যবেক্ষণ : ট্রাইব্যুনাল তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এই মামলার অভিযোগের প্রমাণ, অপরাধের তাৎপর্যতা এবং সাজা প্রদানের জন্য কিছু বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ অভিযুক্তের আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বদান, আলবদর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তার এবং তাদের প্রধান কার্যালয় ঢাকা। অভিযুক্তের ভূমিকা এবং অপরাধকারী হিসেবে তার অংশগ্রহণের ধরন। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সখ্য এবং তাদের সঙ্গে সেনা ক্যাম্পে তার বৈঠক। হিংস তা এবং তার অপরাধের ধরন এবং ভুক্তভোগীদের ঝুঁকি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচারের বিষয়টি যাতে সাজার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়, ট্রাইব্যুনাল সে বিষয়টি লক্ষ্য রেখেছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিনকে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর অপহরণ করে হত্যা করার বিষয়টি বুদ্ধিজীবী হত্যার একই পরিকল্পনা ও নকশার অংশ এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের আলবদর বাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব ছিল। সুতরাং এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান হিসেবে দায়ভার সে কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ৬ নম্বর অভিযোগে বুদ্ধিজীবীদের অস্ত্রের মুখে ঘর থেকে তুলে এনে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও এক নম্বর অভিযোগটি একটি পৃথক অভিযোগ হিসেবে গঠন করা হয়েছে, তথাপি অভিযুক্ত এর দায়ভার এড়াতে পারে না। বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের ঊষালগ্নে এদেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। যেটা গভীরভাবে বাঙালি জাতিকে মর্মাহত করে। ওই সব শহীদ বুদ্ধিজীবী ছিল এদেশের শ্রেষ্ঠ নারী ও পুরুষ। জাতি ৭১-এর ১৪ ডিসেম্বরকে ‘বুদ্ধিজীবী’ দিবস ঘোষণা করে ওইসব বুদ্ধিজীবীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আসছে। এখনও সেই বুদ্ধিজীবীদের পরিবার বিচারের আশায় রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে ১৬ ডিসেম্বরের আগে হত্যা একটি জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে। অভিযুক্ত আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বস্থানীয়। প্রধান দুষ্কৃতকারী হিসেবে বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে সে হত্যা করেছে। সে যেহেতু আলবদর বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছে এবং ঢাকায় তাদের প্রধান অফিস যা ‘টর্চার ক্যাম্প’ হিসেবে পরিচিত, সেখানে বাঙালিদের ধরে নিয়ে ‘দুর্বৃত্ত’, ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়ে নির্যাতন করা হতো। অভিযুক্ত যেহেতু আলবদর বাহিনীর প্রধান এবং ঢাকায় তাদের প্রধান অফিস এবং তার অপরাধ সংঘটনের ধরন, সব কিছু বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। উপরোক্ত পর্যালোচনায় আমরা ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ (ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট) না দিলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।
একনজরে মামলার ধারাবাহিক কার্যক্রম : ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়। গত বছরের ১৬ জানুয়ারি মুজাহিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুাল-১ এ ১০৯ পৃষ্ঠার ৩৪টি বিভিন্ন ঘটনাসহ মোট ছয় হাজার ৬৮০ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফরিদপুর ও ঢাকাসহ সারাদেশে সাধারণ মানুষকে হত্যা, গণহত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয় মুজাহিদের বিরুদ্ধে। এর ১০ দিন পর ২৬ জানুয়ারি এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে একই বছরের ২৫ এপ্রিল মামলাটি দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে নতুন করে অভিযোগের বিষয়ে শুনানি হয়। গত বছরের ২১ জুন মুজাহিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৭টি অভিযোগে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-২। ১৯ জুলাই মুজাহিদের বিরুদ্ধে ২৯ পৃষ্ঠার ওপেনিং স্টেটমেন্ট (সূচনা বক্তব্য) উত্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল ও মীর ইকবাল হোসেন।
এরপর মুজাহিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাকসহ রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষী পর্যায়ক্রমে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। ২০১৩ সালের ২২ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। অন্যদিকে গত ৫ মে মুজাহিদের পক্ষে একমাত্র সাক্ষী হিসেবে সাফাই সাক্ষ্য দেন তার ছোট ছেলে আলী আহমাদ মাবরুর। ট্রাইব্যুনাল সাফাই সাক্ষীর সংখ্যা ৩ জন নির্ধারণ করে দিলেও আর কোনো সাক্ষী হাজির করতে পারেননি আসামি পক্ষ। ৬ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত এবং ৪ ও ৫ জুন মোট ৬ কার্যদিবস রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ ও প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল। আর ২২ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ৬ কার্যদিবসে মুজাহিদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, আইনজীবী মুন্সী আহসান কবির ও অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান।
ট্রাইব্যুনালের ষষ্ঠ রায় : আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মামলার রায়টি হল ট্রাইব্যুনালের ষষ্ঠ রায়। এর আগে পাঁচটি রায় হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ আসে। ৫ ফেব্র“য়ারি দ্বিতীয় রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়, যা প্রত্যাখ্যান করে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান নেয় হাজার হাজার মানুষ। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সেই আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে জনতার দাবির মুখে সরকার ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন আনে। এর মধ্য দিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে দুই পক্ষেরই আপিলের সমান সুযোগ তৈরি হয়। তৃতীয় রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসি দেয়া হয় ২৮ ফেব্র“য়ারি। আর এ রায়ের পর দলটির ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসেবেই পুলিশসহ নিহত হয় ৭০ জনেরও বেশি মানুষ। সেই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাজনীতি সহিংস রূপ নেয়। এরই মধ্যে ৯ মে জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকেও মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এরপর সোমবার একাত্তরের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে গোলাম আযমের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল। এসব রায়ের মধ্যে তিনটি মামলার আপিল সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এছাড়া পলাতক আসামি আবুল কালাম আযাদ কোন আপিল করতে পারেননি।
মুজাহিদের পরিচিতি : ১৯৪৮ সালের ২ জানুয়ারি ফরিদপুরের পশ্চিম খাবাসপুর গ্রামে জš§ নেন মুজাহিদ। পারিবারিক আবহেই তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। তার বাবা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অন্যতম সদস্য আবদুল আলী ১৯৭১ সালে শান্তি কমিটির ফরিদপুর জেলা শাখার প্রধান ছিলেন। গত শতকের ষাটের দশকে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময়েই জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন মুজাহিদ। ১৯৬৮-৭০ মেয়াদে সংগঠনের জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৭০ সালে তিনি ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলা শাখার সেক্রেটারির দায়িত্ব নেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে সংগঠনের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি হন তিনি। মুজাহিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ করেন বলে তার আইনজীবীর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। ছাত্রসংঘের সভাপতি হিসেবে কার্যত পদাধিকার বলেই আলবদর বাহিনীর শীর্ষ পদে চলে আসেন মুজাহিদ। যে পদটিতে আগে ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী, যিনি এখন জামায়াতের আমীর এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কারারুদ্ধ। ৭১-এ আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে মুজাহিদের ভূমিকাই প্রধান করে ট্রাইব্যুনালে দেখিয়েছে প্রসিকিউশন। মুজাহিদের নির্দেশে একাত্তরে দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে ধরে নেয়া হয় বলে ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। এছাড়া স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে সিরাজুদ্দীন হোসেনের মতো জাতির সূর্যসন্তান-বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, যাতে মূল ভূমিকা পালন করে আলবদর বাহিনী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর পুনরুজ্জীবিত জামায়াতে সক্রিয় হয়ে ১৯৮২ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন মুজাহিদ। ১৯৮৯ থেকে দুই বছর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালনের পর ২০০০ সালে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল হন তিনি। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলে এই মুজাহিদের গাড়িতেই উঠেছিল জাতীয় পতাকা। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। মুজাহিদকে ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে আটক করা হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে। তখন থেকে কারাগারেই রয়েছেন তিনি।
 

প্রথম পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close