¦
ঐতিহ্যের রূপকার

ফখরুজ্জামান চৌধুরী | প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৩

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকের কথা। দেশব্যাপী শুরু হয়ে গেছে স্বাধীনতা সংগ্রাম। মার্চ মাসে হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর ক্র্যাক ডাউনের পর কিছুটা বিস্মৃত এবং দিশেহারা মানুষরা ধীরে ধীরে সংহত হয়ে পরবর্তী কর্মসূচি তৈরিতে নিবিষ্ট হয়েছেন। ময়মনসিংহ শহর তখনও দখলদারমুক্ত।
একদিন সন্ধ্যাবেলা শোনা গেল ময়মনসিংহ শহরের উপকণ্ঠে তিনদিকে পাক হানাদার বাহিনীর আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা মধুপুর জঙ্গল পার হয়েছে। টেলিফোনের এক লাইনম্যান খবরটি দিয়েছেন ময়মনসিংহ টেলিফোন এক্সচেঞ্জের অধিকর্তা ইসহাক সাহেবকে। মানিকগঞ্জের অধিবাসী ইসহাক সাহেব অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি। পাক হানাদার বাহিনীর আসন্ন ময়মনসিংহ হামলার কথা জেলার শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ অফিসারদের জ্ঞাত করলেন দায়িত্ববোধ থেকে।
সত্যের খাতিরে বলা প্রয়োজন, ওই দুঃসময়টি তখন ছিল খুবই অপ্রত্যাশিত, অপ্রস্তুত : লোকজন যে যেদিকে পারেন সাময়িকভাবে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটলেন।
আÍীয়-স্বজনবিহীন আমি ও আমার স্ত্রী দিলারা তখন একান্ত অসহায়ভাবে নিয়তির হাতে নিজেদের সমর্পণ করব এমন অবস্থায় হঠাৎ করে ছোট্ট ফিয়াট ৬০০ গাড়ি নিয়ে হাজির হলেন তখনকার ইউনাইটেড ব্যাংক, ময়মনসিংহ শাখার অফিসার সৈয়দ হোসেন জামাল। অনুজপ্রতিম জামাল আমাদের নিয়ে যেতে এসেছেন তার গ্রামের বাড়ি, নদী পেরিয়ে ঈশ্বরগঞ্জে।
শম্ভুগঞ্জ গুদারা পেরিয়ে মনে হল বেঁচে গেলাম, হানাদারের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে আসা গেল!
ঈশ্বরগঞ্জে জামালদের বাড়ি ছোট্ট শহরটার কেন্দ্রস্থলে, প্রধান সড়কের ওপর।
একচালা বাড়ির শানবাঁধানো দাওয়ায় সারাদিন বসে থাকি। দিশেহারা মানুষের ছুটে চলা দেখি। লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে থাকি, পরিচিত কেউ দেখলেও যেন হঠাৎ করে চিনতে না পারে! অজ্ঞাতবাস যাকে বলে!
একদিন মধ্যদুপুরে জনমানবশূন্য রাস্তা। দাওয়ায় মাদুর বিছিয়ে বসে গল্প করছিলাম জামালের সঙ্গে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা। ময়মনসিংহে তালা দিয়ে রেখে আসা বাসা আর সহায়-সম্বলের কথা। এক কাপড়ে যাকে বলে চলে এসেছি জামালের সঙ্গে। সঙ্গে নগদ কিছু টাকা আর স্ত্রীর যৎসামান্য স্বর্ণালংকার। দেশের সেই ঘোরতর দুর্দিনে নিজের বিষয়-সম্পত্তির কথা চিন্তা করা অন্যায় জেনেও মনের কোণে নিজের অজান্তেই ভাবনাচলে আসে ভবিষ্যতের চিন্তা! হায়রে ভবিষ্যৎ!
একজন লোক, পোশাকে-আশাকে কৃষিজীবী বলেই মনে হল। সালাম দিয়ে দাওয়ার এক কোণে জড়সড় হয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ কোন কথা নেই আমাদের কারও মুখে।
এক সময় নীরবতা ভেঙে কথা বললেন আগন্তুক ব্যক্তি : ডাহার (ঢাকার) খবর কী? আমার পা ধরে সালাম করতে গেলেন। কী করেন, কী করেন বলে তাকে নিবৃত্ত করলাম কোন মতে!
ঢাকার খবর আমাদের জানা নেই, বললাম। আগন্তুকের এবারকার প্রশ্ন : ডাহাতুন আইছুন কবে? ঢাকা থেকে কবে এসেছি। জানতে চাইছেন তিনি।
বুঝলাম, কোথাও যেন তার ভুল হচ্ছে। বললাম : আমি তো ঢাকায় থাকি না।
এবার তিনি যে প্রশ্ন করলেন, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না মোটেই। আফনি আমরার ওবায়েদ শেক সাব না?
আমার বিস্ময় অপনোদনের দায়িত্ব নিলেন জামাল। আগন্তুকের সঙ্গে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক টানে কথা বলে তাকে বিদায় দিয়ে আমাকে তিনি বললেন : আসকার ইবনে শাইখ স্যারের চেহারার সঙ্গে এই আগন্তুক আপনার মিল খুঁজে পেয়েছেন তার এবং আপনার উন্নত নাসিকার জন্য! শাইখ স্যার পাশের গ্রামের মানুষ। এলাকায় জনপ্রিয় ব্যক্তি। গ্রামের সহজ সরল মানুষটির জন্য তার শুভকামনা ছিল লক্ষণীয়।
ঢাকায় ফিরে শাইখ স্যারকে কথাটা বলেছিলাম। তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন : নাহ, তোমার নাকের চেয়ে আমার নাক বেশি উঁচু!
শুধু নাক কেন, সব বিবেচনায়ই স্যারের অবস্থান ছিল অনেক উঁচুতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৭-৬১ ব্যাচের যখন ছাত্র আমরা, তখন পরিচয় আসকার ইবনে শাইখ স্যারের সঙ্গে। তিনি ছিলেন স্ট্যাটিস্টিকসের অধ্যাপক। আর আমি ছাত্র বাংলার। ইংরেজি আর ইকোনমিকস সাবসিডিয়ারি হিসেবে নিয়ে নিজের অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্তের কারণে দিশেহারা। পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার আশংকার সামনে সাংস্কৃতিক জগতের কর্মকাণ্ডে যতটা সম্ভব সংযুক্ত থাকি স্যারদের কাছাকাছি থাকার মতলবে। কিন্তু শাইখ স্যার তো এমন বিভাগের শিক্ষক যিনি আমার কোন উপকারেই আসবেন না পরীক্ষার ব্যাপারে সরাসরি।
শুধু মতলবে তো দুনিয়াদারি চলে না! প্রাণের খোরাকও তো লাগে। শাইখ স্যারের সান্নিধ্যে পেয়েছি প্রাণের খোরাক। সহজ সরল মানুষটি কোনরকম মতলবের ধার ধারতেন না। স্পষ্ট, ঋজু ছিলেন আচার-আচরণে, তার শারীরিক গঠনের সঙ্গে মিল রেখে। নাটক অন্তপ্রাণ। তখনকার ইকবাল হকের সঙ্গে সংযুক্ত। আমি এসএম হলের সংযুক্ত ছাত্র। কিন্তু সন্ধ্যায় চলে যাই শাইখ স্যারের কাছে। নাটক থাকলে নাটকের ফায়ফরমায়েশ খাটি। নতুবা স্যারের কাছ থেকে ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্বন্ধে জানি। শুনি তার পরিকল্পনার কথা। ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নাটকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার স্বপ্নের কথা বলেন। তিতুমীর তার স্বপ্নের নায়ক। বাঁশের কেল্লা তার কাছে প্রতিরোধের অভেদ্য দুর্গ।
স্যারের পরিচালনায় প্রথম যে নাটকে আমি যুক্ত হই তার নাম ‘প্রচ্ছদপট’। এখনকার অনেক খ্যাতিমান অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রথম মঞ্চে অবতরণ ঘটেছিল সেই নাটকে। ১৯৫৮ সালের কথা সেটা। এরপর আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে স্যারের ‘টিপু সুলতান’ (১৯৫৮), লালনফকির (১৯৫৯), দেওয়ানা মদিনা (১৯৬০)-এর মঞ্চাভিনয়ে স্যারের কাছাকাছি থেকেছি। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে নিজের কর্মক্ষেত্রে স্যারকে পেয়েছি অন্য ভূমিকায়। কখনও অংশগ্রহণকারী বক্তা হিসেবে, কখনও প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে, কখনও পরামর্শকদাতার অভিভাবকের ভূমিকায় তিনি এসেছিলেন যে প্রতিষ্ঠানে আমি চাকরি করতাম, সেখানে।
পঞ্চাশ-ষাটের দশকে এদেশে নাট্যাভিনয়ের যে ধারার সূচনা হয় তা বিনির্মাণে তিনজনের অবদান কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়। নাট্যগুরু নূরুল মোমেন, শহীদ মুনীর চৌধুরী আর আসকার ইবনে শাইখ।
তারা ছিলেন মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নাট্যকার। নাট্যচর্চার পরিধি থাকে মাঝে বিস্তৃত হতো পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহ কিংবা বাংলা একাডেমী আয়োজিত মাত্র দুই মৌসুম স্থায়ী নাট্য সপ্তাহ উপলক্ষে।
শহীদ মুনীর চৌধুরীকে আমাদের মাঝ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে ’৭১-এর রাজাকার-আলবদর বাহিনী। নূরুল মোমেন স্যার চিরবিদায় নিলেন নব্বইয়ের দশকে। ত্রয়ীর শেষ প্রতিনিধি আসকার ইবনে শাইখ চলে গেছেন, শাইখ স্যার পরিণত বয়সে বিদায় নিয়েছেন, জাগতিক হিসেবে এমন কথা হয়তো বলা যায়। কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল মানুষ, একজন দিশারী সম্বন্ধে এমন বক্তব্য খাটে না।
সত্য বটে, জীবনের শেষ দিকে জরা আর ব্যাধির প্রকোপে কর্মক্ষম ছিলেন না স্যার। কিন্তু তার ছায়া তো ছিল আমাদের মাথার ওপর। সেই যে ছায়া ১৯৪৭ সালে তার লেখা ‘বিরোধ’ নাটক লেখার মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করতে থাকে। একে একে মঞ্চসাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বেতার-টিভিতে তার প্রতিভার স্বাক্ষর পড়তে থাকে। টেলিভিশনে তার প্রথম নাটক ছিল ‘কারিগর’। এরপর একে একে লিখলেন ৩০টি খণ্ড নাটক। ৮টি সিরিজ। আর রেডিওর জন্য লিখলেন ৫০টির বেশি নাটক। তার মঞ্চসফল নাটক এখনও সমান জনপ্রিয়তার সঙ্গে মঞ্চস্থ হয় দেশের প্রান্তে প্রান্তে।
অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সব পুরস্কারের ওপর ছিল শ্রোতা-দর্শকের কাছে তার নাটকের গ্রহণযোগ্যতা। কী মঞ্চে, কী রেডিওতে, কী টেলিভিশনেÑ সব মাধ্যমেই তিনি ছিলেন সপ্রতিভ এবং স্বরাট!
ঐতিহ্যকে তিনি সম্প্রসারিত করেছেন আমাদের আধুনিক মন ও মনকে।
ইতিহাসের কাছে যাওয়া মানে অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। ইতিহাস চেতনা মানুষকে করে মহিমান্বিত, গৌরবদীপ্ত। সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
আমাদের অতীত আছে গৌরবের।
সেই অতীতকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছেন আসকার ইবনে শাইখ।
এমন একজন নির্মাতার মৃত্যু নেই। ১৯২৫-এর ৩০ মার্চ থেকে ২০০৯ সালের ১৮ মে পর্যন্ত যাপিত জীবনকে ছাপিয়ে যাবে তার রেখে যাওয়া সৃষ্টি। হ
 

সাহিত্য সাময়িকী পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close