¦
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ নতুন পর্যায়

বদরুদ্দীন উমর | প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী সরকারি বাহিনী কর্তৃক ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’ ইত্যাদি নামে কথিত আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আবার নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিনই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটছে। এ কাজ করে পুলিশ, র‌্যাব ইত্যাদি বাহিনী থেকে যে রিপোর্ট দেয়া হয় তার মধ্যে কোনো বৈচিত্র্য নেই। কোনো অপরাধী অথবা তাদের সন্দেহভাজন লোককে গ্রেফতার করার পর সেই ব্যক্তি তাদের অস্ত্রের সন্ধান দেয় এবং অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে বন্দুকযুদ্ধে আটককৃত লোক নিহত হয়। এই একঘেয়ে গল্প বছরের পর বছর ধরে আইন রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে শোনানো হচ্ছে। এই গল্পের সত্যতা ও যাচাইয়ের কোনো চেষ্টা কোনো ক্ষেত্রেই হয় না। পুলিশ বা র‌্যাব যা বলে সেটাকে মহাসত্য বলে প্রচার করে সরকার নীরব থাকে। সরকারি কোপানলে পড়া আতংকে থাকা লোকজন আদালতে কোনো মামলা দায়ের করা থেকে বিরত থাকে।
বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনো নতুন ব্যাপার নয়। ১৯৭২ সাল থেকেই এখানে এই হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রক্ষীবাহিনী গঠিত হওয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে বেশ ব্যাপকভাবে হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালে আমরা ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে গঠন করেছিলাম ‘মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইন সাহায্য কমিটি’। ১৯৭৪ সালের ৩১ মার্চ এই কমিটি গঠিত হয়েছিল তৎকালীন জাতীয় প্রেস ক্লাব বিল্ডিংয়ের পেছন দিকে শামিয়ানা খাটিয়ে সেখানে এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন কবি সিকান্দার আবু জাফর, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, কবি জসীমউদ্দীন, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী, এনায়েতুল্লাহ খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আহমদ ছফাসহ আরও অনেকে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন লন্ডন ‘টাইমস’-এর এক সাংবাদিক। তার নাম এখন মনে পড়ছে না। ছিলেন ‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউয়ে’র প্রতিনিধি লরেন্স লিফশুলজ এবং ঢাকার সব সংবাদপত্রের প্রতিনিধি। তখনকার দিনে কোনো সক্রিয় ও উল্লেখযোগ্য বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে এই সম্মেলন ও কমিটি ছিল অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। তখন দেশের সর্বত্র যেভাবে হাজার হাজার রাজনৈতিক বিরোধীদের রক্ষীবাহিনী নিজেদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে এবং অন্যত্র যেখানে-সেখানে হত্যা করছিল, তার প্রতিবাদেই এই সমাবেশ ও সম্মেলন হয়েছিল। বলাই বাহুল্য, সেই হত্যাকাণ্ড যদি না হতো তাহলে রাজনৈতিক নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখে ঢাকায় এ ধরনের ঘটনা কিছুতেই সম্ভব হতো না। ৩১ মার্চ গঠিত উপরোক্ত কমিটির পক্ষ থেকে কয়েকটি মামলা করা হয়েছিল, যার মধ্যে জাসদের কর্মী শাহজাহান হত্যা এবং তৎকালীন সাম্যবাদী দলের নেত্রী অরুণা সেনকে রক্ষীবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার এবং তার ও তার সঙ্গীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলায় আমাদের জয় হয়েছিল। এখানে এসব কথা বলার প্রয়োজন হল এ কারণে যে, সাধারণভাবে জনগণের সব আশা ভঙ্গ করে ব্যাপক আকারে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম থেকেই রাজনৈতিক নির্যাতন ও নিপীড়নের যে প্রক্রিয়া সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক চালু হয়েছিল, তা থেকে বর্তমানে প্রাপ্ত এ সম্পর্কিত পরিস্থিতিকে আলাদাভাবে দেখা এক অবাস্তব ও অনৈতিহাসিক ব্যাপার। সে চেষ্টা কেউ করলে তার দ্বারা বাংলাদেশে যে শাসন প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে, তাকেই অস্বীকার ও বিকৃত করা হবে।
প্রথম পর্যায়ের আওয়ামী লীগ শাসনের পর দুটি সামরিক শাসন পেরিয়ে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার নামে প্রচারিত নির্বাচিত সকারের যে পর্যায় শুরু হল তাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমে এলো না। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে জেলহাজতে আটক লোকদের মৃত্যু এক নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। তখন বলা হতো, এভাবে মৃত্যুর কারণ আটক ব্যক্তির হার্টঅ্যাটাক! অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে হৃযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়েই তাদের মৃত্যু হয়েছিল!! সে কথা বিশ্বাস করত এমন লোকের সংখ্যা বেশি ছিল না। সেই একই কাহিনী দেখা গেল ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে! ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় বিএনপি সরকার গঠন করল র‌্যাব নামে এক নতুন সশস্ত্র বাহিনী। সামরিক বাহিনী ও পুলিশ থেকে লোক নিয়েই প্রাথমিক পর্যায়ে তা গঠিত হয়েছিল। এভাবে র‌্যাব গঠিত হওয়ার পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বলা হতে থাকল ‘ক্রসফায়ার’। প্রত্যেক ক্রসফায়ার হত্যাকাণ্ডের কাহিনী দাঁড়াল একই রকম। আটক ব্যক্তির দেয়া তথ্য অনুযায়ী অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে তাদের গোপন আস্তানায় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আটক ব্যক্তির মৃত্যু। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েই আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী র‌্যাব ও পুলিশ উভয়েই এ কাজ করছিল।
২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় ক্রসফায়ার বন্ধ করার প্রতিশ্র“তি দিয়েই আওয়ামী লীগ নির্বাচন করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করার পর বিএনপির থেকেও ব্যাপকভাবে তারা শুরু করে ক্রসফায়ার হত্যা। এই ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে সারা দেশে এবং বিদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ায় এর নাম পরিবর্তন করে তারা রাখে ‘এনকাউন্টার’। এই ‘এনকাউন্টার’ ও ‘ক্রসফায়ার’ হত্যাকাণ্ড ২০০৮ সালে নির্বাচিত সরকারের পুরো মেয়াদকালে পাঁচ বছর ধরে হয়েছে। এটা এখন আবার বেশ জোরেশোরে নতুনভাবে দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনই এই হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক ঘটছে। এর কিছু কিছু খবর সংবাদপত্রের রিপোর্টে পাওয়া গেলেও সব ঘটনার রিপোর্ট প্রকাশিত হয় না। সেটা জানা যায় বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় লোকদের রিপোর্ট থেকে। তাছাড়া পুলিশ ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে যা বলা হয়, তাতে নিহতদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়া হয়। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে, একে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’ বললেও এভাবে কথিত বন্দুকযুদ্ধে পুলিশ বা র‌্যাবের কেউ নিহত হয় না। নিহত হয় শুধু ‘সন্ত্রাসীরাই’!
বিচারবহির্ভূত যে হত্যাকাণ্ড এখন দেশজুড়ে ব্যাপক আকারে হচ্ছে, এর কিছু রিপোর্ট সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলেও তার ওপর কোনো গুরুত্ব নেই। এ ধরনের ভয়াবহ ব্যাপারের বিরুদ্ধে তথাকথিত সুশীল সমাজের বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, যদিও মানবাধিকার সংগঠন নামে পরিচিত কোনো কোনো সংগঠন দায়সারা গোছে প্রতিবাদ করে। রাজনৈতিক মহলে এর বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ হওয়া দরকার তা হয় না। এর বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন হয় না। কাজেই শক্তিশালী বিরোধিতার অভাবকে সরকার ছাড়পত্র হিসেবে ধরে নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখন বেশ নির্বিঘ্নেই চালিয়ে যাচ্ছে! জনগণের জীবন ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এ হত্যাকাণ্ডের পুরো ব্যাপারটি এক ট্রাজেডি হলেও এর একটা হাস্যকর দিকও আছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই তার কতগুলো রুটিন বা বাধাধরা কথার মধ্যে এটাও বলে থাকেন যে, তিনি ও তার সরকার কোনো ধরনের সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সহ্য করবেন না এবং সন্ত্রাস নির্মূল করাই তাদের শাসন কাজের এক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য! গত ২০ ফেব্র“য়ারি একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানেও তিনি বেশ জোর দিয়ে এ কথা বলেছেন, যদিও সে ধরনের অনুষ্ঠানে এ ধরনের কথা বলার বিশেষ কোনো প্রাসঙ্গিকতা ছিল না। কিন্তু প্রাসঙ্গিক কথা বলার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কোনো দায়দায়িত্ব আছে এটা জোর দিয়ে বলার উপায় নেই। তার দু’-তিনটি রেকর্ড আছে, যা প্রতিদিনের নানা ধরনের অনুষ্ঠানে তিনি বাজিয়ে থাকেন। যাই হোক, এ নিয়ে কথা বাড়ানোর প্রয়োজন আমাদের নেই। মূল কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে এখন নিয়ম-শৃংখলা বলে কিছু যেমন কোনো ক্ষেত্রেই নেই, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই যেমন নৈরাজ্যে জনগণের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে, তেমনিভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও জনগণের জীবনে নিরাপত্তার চাদর ছিন্নভিন্ন করছে। কাজেই ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’ যাই হোক, ইত্যাদির সঙ্গে গুম খুন এখন বেশ ব্যাপক আকারেই হচ্ছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীর হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার এবং অপরাধীদের শাস্তির কোনো নামনিশানা যে নেই, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। নিষ্ফল হলেও সাগর-রুনীর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিবাদ সাংবাদিক মহলে হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু অন্য যেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে তার কোনো সুরাহা তো দূরের কথা, বিচারের সামান্য কোনো উদ্যোগও সরকারি মহলে দেখা যায় না। কাজেই সরকার নিজেই যেখানে এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নানাভাবে করে চলেছে, কোনো ক্রাইমেরই বিচার যেখানে হচ্ছে না, অপরাধীরা যেখানে নিশ্চিন্ত, সেখানে যে ব্যাপকভাবে অপরাধের বিস্তার ঘটবে এতে অবাক হওয়ার কী আছে? বাংলাদেশে আইন-শৃংখলা নিয়ে সরকারিভাবে যত বাগাড়ম্বরই করা হোক, সরকারের কর্মকাণ্ডই দেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির মূল কারণ।
২২.০২.২০১৪
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
 

উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
    ৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

    ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

    প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

    পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

    Developed by
    close
    close