¦
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আসল চরিত্র

বদরুদ্দীন উমর | প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৫

ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) সভাপতি মোহন ভগবৎ গত ১২ জুন মথুরায় তাদের দলের এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি উপলক্ষে দেয়া এক বক্তব্যে বলেছেন, ভারত, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিকই হিন্দু! এই তত্ত্ব এবং একই সঙ্গে বিপজ্জনক বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র। এ বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আর এ বিশ্বাসেই আমাদের আটকে থাকতে হবে। নিজেদের এলাকা ভিন্ন করেই নিতে পারি আমরা। কিন্তু তাতে ভারত যে একটি হিন্দু জাতির দেশ, সে বিষয়টি কোনোভাবেই বাতিলের খাতায় ফেলা যেতে পারে না (যুগান্তর, ১৪.০৬.১৫)। তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ নিজেদের হিন্দু বলেন। কেউ বলেন, তারা ভারতীয়। এমন মানুষও আছেন যারা নিজেদের আর্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং অনেকে বলেন, তারা মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী নন। কিন্তু এসব বক্তব্যে ভারত যে একটি হিন্দু রাষ্ট্র, তা মনে করতে কোনো বাধা নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে যারাই বাস করেন, তাদের প্রত্যেকেই হিন্দু জাতির অংশ। তাদের পৃথক নাগরিকত্ব থাকতে পারে। কিন্তু তাদের জাতীয়তা হিন্দুত্ব। নিজের বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য তিনি ইতিহাসের দিকে তাকানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, স-কে হ হিসেবে উচ্চারণ করত আরবীয়রা। সে কারণেই তারা আমাদের হিন্দু বলত, কারণ আমাদের দেশে সিন্ধু নামের একটি নদী ছিল। এটা সেই এলাকায় ছিল যেখান থেকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয় বাংলাদেশ। এ কারণে ওই অঞ্চল দুটোতে বসবাসকারী মানুষের নাগরিকত্ব আলাদা হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে তারা তাদের বাড়িঘর কিংবা জাতীয়তা ত্যাগ করেননি। সেজন্যই আমি বলি, তাদের জাতীয়তাবাদ এখনও একই রয়েছে।” এ পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের দলের লক্ষ্য ও কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আরএসএসের ঘাঁটি সম্প্রসারণের জন্য এটাই সঠিক সময়। আরও উঁচু ইমারত তৈরির জন্য আরও মজবুত ভিত তৈরি করতে হবে আমাদের। (যুগান্তর, ১৪.০৬.১৫)।
২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে আরএসএসের সংঘ পরিবারের দল বিজেপি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও ফ্যাসিস্ট হিন্দুত্ববাদীদের ঔদ্ধত্য কতখানি বৃদ্ধি পেয়েছে তারই এক প্রামাণ্য উদাহরণ হল আরএসএসের সভাপতি মোহন ভগবতের উপরোক্ত উন্মাদতুল্য বক্তব্য। নির্বাচন জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের গদিতে বসেই নরেন্দ্র মোদি এই একই কথা বলে ঘোষণা করেছিলেন, তার ঘরওয়াপসি অর্থাৎ ঘরে ফেরার কর্মসূচি। এ কর্মসূচি অনুযায়ী তিনি বলেছিলেন, ভারতের সব লোকই হিন্দু। তাদের ওপর জুলুম করে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মান্তকরণ ঘটিয়েছিল। কাজেই সেভাবে ধর্মান্তরিত লোকদের সবাইকেই হিন্দু ধর্মের কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। নরেন্দ্র মোদির এ ঘোষণার পর তাদের সংঘ পরিবারের অন্য দল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল ইত্যাদি ভারতের গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, কর্নাটক, বিহার, এমনকি পশ্চিমবঙ্গে জোরপূর্বক খ্রিস্টান ও মুসলমানদের হিন্দু ধর্মান্তকরণ শুরু করে। আসলে এ কর্মসূচি সংঘ পরিবারের মূল দল ও আদর্শের ধারক-বাহক আরএসএসেরই কর্মসূচি। এভাবে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের নরেন্দ্র মোদির ঘরওয়াপসি কর্মসূচি অনুযায়ী ধর্মান্তকরণ শুরু হওয়ায় ভারতে তার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ শুরু হয়। এছাড়া ভারতের বাইরেও বিভিন্ন দেশে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়, যদিও বাংলাদেশে আওয়ামী ঘরানার কাঠামোর মধ্যে অবস্থিত অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি! উপরন্তু ঘরওয়াপসি কর্মসূচির প্রবক্তা নরেন্দ্র মোদিকে তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সময় এ দেশের পরম বন্ধু ও পরিত্রাতা বলে এ মহলে অনেক ঢাকঢোল পেটানো হয়েছে!
মোহন ভগবতের উপরোক্ত বক্তব্য প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে বলা দরকার, তিনি ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের লোকদের হিন্দু জাতিভুক্ত বলে যেভাবে ঘোষণা করেছেন তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, তিনি শুধু ভারতের মুসলমান ও খ্রিস্টানদেরই হিন্দু ধর্মান্তরিত করার লক্ষ্যকে বাতিলের খাতায় রাখেননি, তার লক্ষ্য পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতিও প্রসারিত! এভাবেই তিনি আরএসএসের ঘাঁটি সম্প্রসারণ এবং তার জন্য আরও উঁচু ইমারত তৈরির জন্য মজবুত ভিত তৈরির আহ্বান তার দলের কর্মীদের কাছে জানিয়েছেন! ধর্মান্ধতা এবং ক্ষমতার মদমত্ততা মানুষকে কতখানি উদ্ধত ও উন্মাদ করতে পারে, মোহন ভগবতের এ লক্ষ্য ও কর্মসূচি তারই অভ্রান্ত উদাহরণ। এ চিন্তাধারা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ভারতের নীতিনির্ধারণে কী প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা বোঝার কোনো অসুবিধা নেই।
হিন্দু জাতি সম্পর্কে মোহন ভগবতের বক্তব্য ইতিহাস বিষয়ে মূর্খতারই পরিচায়ক। স উচ্চারণ করতে অপারগতার কারণে আরবরা সিন্ধুকে হিন্দু বলে ভারতের অধিবাসীদের হিন্দু বলত- এর কোনোই ভিত্তি নেই। প্রথমত, আরবরা যদি স উচ্চারণ করতে না পারত তাহলে তারা আসসালামু আলাইকুম বলত কীভাবে? দ্বিতীয়ত, আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের পর গ্রিকরা সিন্ধুকে বলত ইন্দু। তার থেকেই আরবরা বলত হিন্দু। কাজেই মোহন ভগবৎ কথিত হিন্দু জাতির নামকরণ করেছিল আরব, তুর্কি, ইরানি মুসলমানরা। হিন্দু বলে কোনো শব্দ বা কোনো জাতির নাম বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারতসহ কোনো হিন্দু ধর্মগ্রন্থে নেই। তাছাড়া হিন্দুস্থান বলে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ভারতকে শুধু হিন্দুদের দেশ বলে প্রচার করলেও ভারতের নাম হিন্দুস্থান দিয়েছিল তারাই। সিন্ধুকে হিন্দু বলে তারা বোঝাত ভারতের ওই অঞ্চলের লোককে। তার সঙ্গে জাতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। লক্ষ্য করার বিষয় যে, মোহন ভগবৎ দুরভিসন্ধির কারণে হিন্দুকে একটা জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করে বোঝাতে চেয়েছেন তারা ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া থেকে মুসলমান ধর্মাবলম্বী যারা এসেছিল তারাও ছিল মোহন ভগবৎ কথিত হিন্দু জাতির অংশ! এই হিসেবে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের লোকেরা হল হিন্দু!! তাদের একাধিক দেশের নাগরিক বললেও তারা জাতিগতভাবে অভিন্ন। তারাও আরএসএস এবং ঘরওয়াপসি কর্মসূচির লক্ষ্য!!!
এদিক দিয়ে বিজেপি ও তাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে মোহন ভগবতের আদর্শ এবং আরএসএসের ঘাঁটি সম্প্রসারণের কর্মসূচি থেকে পৃথক করে দেখার কোনো উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে তফাৎ এখন শুধু এটাই যে, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদি প্রাথমিকভাবে ঘরওয়াপসি কর্মসূচি ঘোষণা করলেও এর বিরুদ্ধে ভারতের অভ্যন্তরেও প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়ে তারা নিজেরা সরাসরি এ কর্মসূচি নিয়ে আর কোনো কথাবার্তা না বলে আরএসএস এবং তাদের সংঘ পরিবারের অন্যান্য দল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল ইত্যাদির মাধ্যমে সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নের কৌশল অবলম্বন করেছেন। সেটা না হলে তারা এসব চরম প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দু সংগঠনগুলোর উপরোক্ত কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডের সরাসরি বিরোধিতা করতেন। একদিকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেয়া এবং অন্যদিকে মুখে ধর্মবিযুক্ততার খই ফোটানো বক্তব্য যে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির ভণ্ডামি ও প্রতারণার উদাহরণ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিষয়টিকে এভাবে না দেখে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশ, তাদের সরকার এবং এ সরকারের সঙ্গে গাঁটছড়ায় বাঁধা বুদ্ধিজীবীরা এখন স্বয়ং মোদিকে ধর্মবিযুক্ত রাজনীতির প্রবক্তা ও ধারক-বাহক হিসেবে ধরে নিয়ে তার মহিমা কীর্তন করছে! বাংলাদেশে তাদের আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার পথই প্রশস্ত করছে!! তাদের জন্য বাংলাদেশের দরজা খুলে দিয়েছে!!!
নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সময় এরা যেভাবে তাকে কার্যত বাংলাদেশের জমিদার হিসেবে নানা ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদানে উৎসাহিত করেছে, তার বক্তব্যে পুলকিত হয়ে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে, এটা কোনো স্বাধীন ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন দেশের কাজ নয়। শুধু তাই নয়, মোদি ঢাকায় এসে যেসব চুক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন, তাতে এ দেশের বিশেষ কোনো লাভ না হলেও ভারতীয় স্বার্থেরই জয়জয়কার হয়েছে। বাস্তবত ভারতের এ বিজয়কে ধাপাচাপা দিয়ে এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কী লাভ হয়েছে তাই নিয়ে এরা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যমে ঢাকঢোল পিটিয়ে চলেছে। তারা বাংলাদেশকে নিজেদের অধীনতার শৃংখলে কীভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার ব্যবস্থা করেছে, সে বিষয়ে কোনো কথার মধ্যে না গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যার প্রশংসায় যেভাবে তিনি পঞ্চমুখ হয়েছেন তাকেই এরা বাংলাদেশের এক বড় অর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করছে!! বাস্তবত বাংলাদেশকে সামান্য সুবিধা দিয়ে তারা বাংলাদেশকে যেভাবে বঞ্চিত করেছে এবং নিজেদের অধীনতা পাশে আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে, তার ধারেকাছেই না যাওয়াকে এভাবে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া ছাড়া আর কিছুই বলার উপায় নেই। তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়ে কোনো চুক্তি যে তারা করেনি, এখনও পর্যন্ত তারা যে এ চুক্তিকে আশ্বাসের খাতায় রেখে বাংলাদেশকে তার ন্যায়সঙ্গত পাওনা থেকে বঞ্চিত রেখেছে, সে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে বিশেষ কোনো উচ্চবাচ্য বা চাপ সৃষ্টি করেনি। ভারতের কাছে বাংলাদেশের নতজানু অবস্থার এর থেকে বড় প্রমাণ আর কী আছে?
২০.০৬.২০১৫
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close