Logo
Logo
×
   

Advertisement

শিক্ষাঙ্গন

ভিসি নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় যখন হাতিয়ার

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

ভিসি নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় যখন হাতিয়ার

ছবি: এআই জেনারেটেড

Advertisement

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ উপাচার্য (ভিসি)। শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক যেন থামছেই না। কোথাও নিয়োগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রজ্ঞাপন বাতিল হয়েছে, আবার কোথাও নিয়োগের কয়েক মাসের মধ্যেই ভিসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়েও আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে পছন্দের প্রার্থীকে ভিসি পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও ভিসি নিয়োগে মেধা, যোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, গবেষণা ও একাডেমিক অর্জনের চেয়ে অন্য বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ পাওয়া বেশ কয়েকজন ভিসিকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে নানা বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত পছন্দ, দলীয় ঘনিষ্ঠতা, সুপারিশ ও তদবিরের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই লেনদেনের অঙ্ক ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। দেশের একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষক সিন্ডিকেট এসব নিয়োগে সক্রিয় ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক ভিসি নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে রাজনৈতিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্টদের দাবি, উপাচার্য নিয়োগে প্রার্থীর যোগ্যতা, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও একাডেমিক সাফল্যের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এমন অভিযোগের মধ্যেই আলোচনায় এসেছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাতের ঘটনা। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির নতুন চার সদস্য পদ পাওয়ায় গত ১৭ আগস্ট ভিসির অফিসিয়াল প্যাডে পৃথক অভিনন্দন বার্তা জানান তিনি। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নিরপেক্ষ দায়িত্ব হওয়ায় কোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানানোর ঘটনায় তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগ পাওয়া ভিসিদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁদের হিসাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব ছিল, বিপরীতে মাত্র ৩০ শতাংশ নিয়োগে যোগ্যতা, দক্ষতা ও একাডেমিক মেধাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য গত ২ এপ্রিল ছয় সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে ভিসি নিয়োগে অনিয়ম ও বিতর্কের বিষয়ে জানতে কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মো. মোর্শেদ হাসানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

কমিটির আরেক সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, তিনি এসব বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানেন না।

ফলে ভিসি নিয়োগের প্রক্রিয়ায় সার্চ কমিটির ভূমিকা, প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কী ধরনের মূল্যায়ন করা হচ্ছে—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ মনে করেন, ভিসি নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তার মতে, যারা নিজেরা এই পদের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন বা তদবির করেন, তাদের সবার আগে বাদ দেওয়া উচিত। এমনকি ভিসি পদে আবেদন করে আসার বিষয়টিও তিনি সমর্থন করেন না।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবার অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ফিরে আসবে কিনা, সেটিও এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

উপাচার্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধানই নন, তিনি একই সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা, একাডেমিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অভিভাবক। তাই এই পদে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা তদবিরের পরিবর্তে যোগ্যতা, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা, সততা ও একাডেমিক নেতৃত্বের সক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি বলে মত শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম