নিষিদ্ধ একাশিয়া-ঝাউ গাছে হুমকির মুখে নোবিপ্রবির জীববৈচিত্র্য
Advertisement
নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
নিষিদ্ধ একাশিয়া-ঝাউ গাছে হুমকির মুখে নোবিপ্রবির জীববৈচিত্র্য
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কথা চিন্তা না করেই অব্যাহত রয়েছে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত বিদেশি প্রজাতির ‘আকাশমণি’ বা 'একাশিয়া' গাছ এবং ঝাউ গাছের একচ্ছত্র আধিপত্য।
সম্প্রতি আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাস প্রজাতিকে ক্ষতিকর ও আগ্রাসী চিহ্নিত করে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও ক্যাম্পাসে পরিবেশবান্ধব দেশীয় বৃক্ষরোপণ কিংবা এসব ক্ষতিকর গাছ অপসারণের পরিপূরক কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বরং এগুলোর প্রতিই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের ঝোক লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন-১ শাখা থেকে জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়- পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিপর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে আগ্রাসী প্রজাতির ইউক্যালিপটাস এবং আকাশমণি গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো। একই সঙ্গে এসব আগ্রাসী প্রজাতির বদলে দেশীয় প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করে বনায়ন করার স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশমণি গাছের আধিপত্য বাস্তুসংস্থানের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই গাছ মাটির অত্যন্ত গভীর থেকে ভূগর্ভস্থ পানি শোষণ করে আশপাশের এলাকাকে রুক্ষ করে তোলে। পাশাপাশি এর পাতা পচে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ও অ্যালিলোপ্যাথিক প্রভাবের কারণে অন্যান্য উদ্ভিদ গজানোর ক্ষমতা নষ্ট করে। এছাড়া এর পরাগরেণু বাতাসে ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের হাঁপানি ও অ্যালার্জির মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে। অন্যদিকে ঝাউ বা বিদেশি কাষ্ঠল গাছগুলো পাখির প্রাকৃতিক খাদ্য ও সঠিক স্থায়ী আবাসের চাহিদাও পূরণ করতে সক্ষম নয়।
এছাড়া নোবিপ্রবি যেহেতু দুর্লভ বন্যপ্রাণী ও অভিবাসী (পরিযায়ী) পাখিদের একটি নিরাপদ অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে, তাই এই ১০১ একরের ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গাছে নানা প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণী বসবাস করে; কিন্তু আকাশমণি বা ঝাউয়ের মতো বিদেশি গাছগুলোতে দেশীয় পাখিদের খাওয়ার মতো কোনো ফল ধরে না এবং এগুলোতে পোকা-মাকড়ের উপস্থিতি কম থাকায় পাখির ছানাদের প্রোটিনের মূল উৎসও মেলে না। ফলে ক্যাম্পাসে এসব গাছের আধিপত্য বাড়ায় পাখ-পাখালি ও বন্যপ্রাণী তীব্র খাদ্য সংকটে পড়ছে, যা তাদের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি ব্যাহত করার পাশাপাশি পুরো ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসব প্রজাতি বর্জন করার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ক্ষতিকর গাছগুলো পর্যায়ক্রমে কেটে অপসারণ করা কিংবা সেখানে সুফলদায়ী দেশীয় ফলদ, ঔষধি ও ছায়াদার গাছ (যেমন- বট, কড়ই, আমলকি, সজিনা বা কৃষ্ণচূড়া) লাগানোর কোনো কার্যকর প্রশাসনিক পরিকল্পনা বা দৃশ্যমান উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাউসার হোসেন বলেন, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাস গাছের চারা রোপণ ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দ্রুত বেড়ে ওঠা ও কাঠের বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে দেশে এসব গাছ বেশি দেখা গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর কোনো উপকারিতা নেই। এছাড়া ক্যাম্পাসের মাটিতে এক সময় দৃঢ়তা আনার জন্য ঝাউ গাছ রোপণ করা হলেও, বর্তমানে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। বরং ঝাউ গাছের নিচে ঘাস বা অন্যান্য উপকারী গাছগুলো আলো-বাতাসের অভাবে বাড়তে পারছে না। খুব বেশি হলে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে ঝাউ গাছ নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সিম্বলিক হিসেবে রাখা যেতে পারে। তবে বেশিরভাগ অংশই ছেঁটে ফেলে এর বদলে নাগেশ্বরী, নিম, অর্জুনসহ বিভিন্ন দেশীয় ফলদ, কাষ্ঠল ও ঔষধি গাছ লাগানো প্রয়োজন।
পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ঝাউ গাছটা একটু বেশি বাড়ে। আর আকাশমণির রেনুগুলো মূলত বেশি সমস্যা করে এলার্জির মাধ্যমে।
একাশিয়ার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও কৃষি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. গাজী মহসিন বলেন, আকাশমণি গাছ পরিবেশের জন্য বেশ ক্ষতিকর, তাই এটি না লাগানোই ভালো। তবে ঝাউ গাছ নোবিপ্রবির ঐতিহ্যের অংশ। এস্টেট শাখার বৃক্ষরোপণ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তারা নিলে পরিবেশবান্ধব ভালো বিকল্প বেছে নেওয়া সম্ভব হতো। এছাড়া নোয়াখালীর আবহাওয়ায় সাধারণ ফলদ গাছ (যেমন আম, জাম, কাঁঠাল) খুব ভালো না বাড়লেও জলবায়ু উপযোগী অন্যান্য উপকারী গাছ লাগানো সম্ভব।
