Logo
Logo
×

Advertisement

শিক্ষাঙ্গন

সেই শিক্ষার্থীকে নিয়ে জবি শিক্ষকের আবেগঘন স্ট্যাটাস

Advertisement

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ মে ২০১৯, ০৬:১২ পিএম

সেই শিক্ষার্থীকে নিয়ে জবি শিক্ষকের আবেগঘন স্ট্যাটাস

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

সোনার চামচ মুখে নিয়ে সবাই জন্মায় না। ছেলেবেলা থেকে সংগ্রাম করে পরিবারের সব দায়িত্বকে পালন করে একসময় সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন, এমন অনেক নজির রয়েছে।

বেশ কয়েকদিন ধরে খাবার জোটেনি তবুও সে কথা কাউকে না জানিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদাহরণও রয়েছে।

তেমনই এক জীবন সংগ্রামীর কথা জানিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি প্রক্টর ড. শাহ মো. আরিফুল আবেদ।

এ বিষয়ে গত ৩০ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি, যা রীতিমতো ভাইরাল।  

সেখানে তিনি তার কর্মজীবনের এক অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। জানিয়েছেন সেই জীবন সংগ্রামীর সফলতার গল্প।

 ড. শাহ মো. আরিফুল আবেদের আবেগঘন সেই স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-

‘এই আমি পর্যন্ত প্রথম দিকে যখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি তখন সব সময় ছাত্রদের শাসনে রাখতাম। কাছে ভিড়তে দিতাম না। ভাবতাম, কাছে আসতে দিলেই নানা আবদার জুড়ে দেবে! আর শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কে একটু দূরত্ব থাকাই সমীচীন।

কিন্তু না, আমার এই ভুল ধারণা অচিরেই ভেঙে যায়। দিনে দিনে তাদের সঙ্গে মিশতে থাকি, একাডেমিক হোক বা প্রশাসনের অংশ থেকে হোক, আমি তাদের জীবন সংগ্রাম দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি!

কত ঘটনার কথা বলব, শত শত জমা আছে গভীরে। শুধু দিন তিনেক আগের একটা ঘটনা শেয়ার করি।

সম্প্রতি পুলিশের এসআই নিয়োগ পরীক্ষা চলছে। ছেলেটি কাগজপত্র সত্যায়িত করতে আসে। নিজের রুমে বসে আছি, হাত মুখ ধুয়ে মাত্র দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় সে এসে হাজির। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাচুমাচু করছিল, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলাম।

প্রথম ধাক্কায় মনে হল, ছেলে নেশাগ্রস্ত নয়তো শারীরিকভাবে অসুস্থ।

কাগজপত্র এগিয়ে দিল, আমি একে একে স্বাক্ষর করছি আর অল্পস্বল্প তার বিবিধ জিজ্ঞেস করছি। এই আলাপপর্ব আমি প্রায়ই করে থাকি।
- বাবা, তুমি কি নেশাটেশা কর?

ছেলেটি: না, স্যার।
-রাত জাগো?

ছেলেটি: জ্বী না স্যার।
ছেলেটির লিকলিকে শরীর আর কাগজপত্র, ছবি স্বাক্ষরের সময় যখন একটা একটা কাগজ টেনে নিচ্ছিল তখন খেয়াল করছিলাম ছেলেটির হাত একটু কাঁপছে। তাই ভণিতা না করে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।
-তাহলে তোমার এই অবস্থা কেন? দেখে তো সুস্থ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।

ছেলেটি: মেসে থাকি তো, খাওয়া ও ঘুমের ঠিক নেই স্যার।

জিজ্ঞেস করলাম, টিউশনি কর কয়টা?

ছেলেটি: তিনটা। এই মাসে আর একটা নিয়েছি।
-কত পাও সব মিলিয়ে?

ছেলেটি: ছয়-সাত হাজার, স্যার
-টাকাগুলো দিয়ে কী কর?

ছেলেটি: বাড়িতে পাঠাই কিছু, গ্রামে বাবা-মা আর ছোট একটা ভাই থাকে। বাকিটা মেস ভাড়া, মিল খরচ আর পড়াশোনার ব্যয় স্যার।
-বুঝলাম, তুমি তোমার খরচ চালিয়েও বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছ। কিন্তু তোমার স্বাস্থ্যের এই ভগ্নদশা কেন? খাওয়া-দাওয়া নিয়মিত কর না?

ছেলেটি: করি স্যার।  তবে সবসময় খাওয়া হয় না। সকালে ভার্সিটিতে আসি, ক্লাস শেষ করে টিউশনিতে চলে যাই। মেসে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা-এগারটা। টিউশনির বাসায় যে নাস্তা দেয় তাই দিয়ে দুপুরেরটা চালিয়ে নিই, অবশ্য মাঝেমধ্যে দেয় না। এভাবেই দিন চলে।

আমি গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। দুই সেট অনেকগুলো কাগজ স্বাক্ষর করতে করতে এক সময় মনে হল, কলম আর চলে না। আমি আর ওর দিকে তাকাতে পারছি না।
মাথাটা নিচু করে বললাম, মাঝে সাঝে খেতে না পারলে অন্তত মুড়ি খাবে। তবুও খালি পেটে থেকো না। মুড়ি খেয়ে কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে নেবে। দেখবে শরীরে অনেক বল পাবে।

ছেলে এবার যা বলল, এর জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

খুব ক্ষীণকণ্ঠে হা করা মুখের দিকে হাতটা নিয়ে তর্জুনি দিয়ে মাড়ির দিকে নির্দেশ করে বলল, স্যার, গত কয়েকদিন ধরে মুড়িই খেয়ে আছি। এই মাসের মেস ভাড়া, মিল খরচের টাকা দিতে পারিনি। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার টাকা আর গত মাসে বাড়িতে গিয়েছিলাম মাকে দেখতে। মা অনেকদিন ধরে পীড়াপীড়ি কান্নাকাটি করছিলো, অনেকদিন বাড়ি যাই না। বাড়ি যেতে অনেক খরচের ব্যাপার। ছোট ভাইটা অনেক আবদার করে রাখে, আব্বা অন্যের আমবাগানে কাজ করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে কোমর ভেঙে বেশকিছু দিন শয্যাশায়ী। মা শুধু কাঁদে আমাকে এক নজর দেখবে, তাই গেলাম। অনেক খরচ হয়ে গেল গত মাসে।

আমি বাকরুদ্ধ, নিশ্চুপ হয়ে শুধু শুনছিলাম। গলাটা আমার ধরে আসছিল। স্বাক্ষর শেষে শুধু একটাই প্রশ্ন করলাম।
-এই যে এসআই পরীক্ষা দিতে খুলনা যাচ্ছো, ভাড়া আছে যাওয়ার?

ছেলেটি: না, নেই স্যার। যাব কি না মনস্থির করি নাই। দেখি, বন্ধুদের কাছে ধার চাইব। এক হাজার টাকা হলেই হয়ে যাবে। কিন্তু জানি না ব্যবস্থা হবে কিনা! তবুও কাগজপত্র ঠিক করে রাখলাম।

এতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখেছিলাম ছেলেটিকে। বুঝতে পারছিলাম এই অর্ধবেলা পর্যন্ত ছেলেটির পেটে কোন দানাপানি পড়েনি। আমার লাঞ্চবক্সে দুইটা রুটি ছিল। দুজনে ভাগ করে খেলাম। ও খেতে চায়নি। এক প্রকার জোর করে বসালাম।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র শিক্ষক আমি, মানিব্যাগ ঝেড়ে দেখি বেশি টাকা নেই। এক কলিগকে ফোন করে বললাম, এক হাজার টাকা ধার দিতে পারবে কিনা। বলল, পারবে। ছেলেটিকে নিয়ে আসতে পাঠালাম। নিয়ে আসলো।

টাকা ওর হাতে দিয়ে বললাম, এই টাকা তোমাকে ধার হিসেবে দিলাম। চাকরি পেয়ে ফেরত দেবে।

প্রথমে নিতে খুবই আপত্তি করল। যখন দেখল, আমি সত্যি সত্যি ধার হিসেবে দিচ্ছি তখন আর দ্বিধা করল না।

আজ ফোন দিয়ে জানালো, সে প্রাথমিকভাবে এসআই বাছাই পরীক্ষায় নির্বাচিত হয়েছে। আমি আনন্দিত। ওর জন্য সবার দোয়া চাই। মহান সৃষ্টিকর্তা যেন ওর মনে আশা পূরণ করে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জীবন সংগ্রাম কাছে থেকে না দেখলে বোঝার কোন উপায় নেই। কত টাকা আমরা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে ওয়েটারকে বখশিস দিয়ে আসি। অনেক অহেতুক খরচ করি।

প্লিজ, একটিবার আপনার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রতিবেশী ছাত্রটির খবর নিন। তাকে সাহায্য নয়, ধার দিন। প্রয়োজনে লিখে রাখুন টাকার অংকটা, একদিন সে বহুগুণ ফেরত দেবে আপনাকে, জাতিকে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারি প্রক্টর, বাংলা বিভাগ, ড. শাহ মো. আরিফুল আবেদের ফেইসবুক থেকে

 

Advertisement

এসআই ড. শাহ মো. আরিফুল আবেদ

Advertisement

আরও পড়ুন

মাদ্রাসা প্রধানদের জন্য নতুন নির্দেশনা

মাদ্রাসা প্রধানদের জন্য নতুন নির্দেশনা

ঢাবির হল থেকে ছাত্রলীগ নেতা আটক

ঢাবির হল থেকে ছাত্রলীগ নেতা আটক

গুরুদাসপুরে পাঁচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাশ করেনি কেউ

গুরুদাসপুরে পাঁচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাশ করেনি কেউ

এইচএসসিতে চট্টগ্রাম বোর্ডে প্রথম তামযীদ, নম্বর কত পেলেন

এইচএসসিতে চট্টগ্রাম বোর্ডে প্রথম তামযীদ, নম্বর কত পেলেন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম