ফাঁকা ঢাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস
হর্নমুক্ত সড়কে নির্মল বাতাসের ছোঁয়া
সাইফ আহমাদ
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ঈদের লম্বা ছুটির কারণে বুধবার রাজধানীর সড়ক ছিল অনেকটা ফাঁকা। বনানী থেকে তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আর মাত্র দুদিন বাকি। সরকার ঘোষিত টানা সাত দিনের ছুটির দ্বিতীয় দিনেই অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে রাজধানী ঢাকা। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন মানুষ। ফলে বছরের অধিকাংশ সময় যানজট, কোলাহল আর বায়ুদূষণে ডুবে থাকা ব্যস্ত মহানগরী যেন হঠাৎ বদলে গেছে। শান্ত, নির্মল ও স্বস্তিদায়ক এখন এই শহর। বুধবার রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো ঘুরে দেখা গেছে চিরচেনা ব্যস্ত ঢাকার ভিন্ন চিত্র। যেসব সড়কে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়, সেসব সড়ক এখন প্রায় ফাঁকা। নেই হর্নের কর্কশ শব্দ, নেই গাড়ির দীর্ঘ সারি। অলস দুপুরে রোদের আলো-ছায়া খেলা করছে ফাঁকা রাস্তায়। আর হালকা বাতাসে মিলছে স্বস্তির ছোঁয়া। নগরজীবনের ক্লান্তি ভুলে এমন পরিবেশে স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন তারা, যারা ঈদের ছুটিতে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছাড়ছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। কর্মব্যস্ত জীবনে এ সময়টুকুই হয়ে ওঠে পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ। তাই বাস, ট্রেন ও লঞ্চে রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছেন কোটি মানুষ। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে নগরজীবনে। কমেছে যানবাহনের চাপ, হালকা হয়েছে বায়ুদূষণ, আর কমেছে শব্দদূষণও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-অতিরিক্ত যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণ কাজের ধুলা এবং শিল্পকারখানার নির্গমন। ঈদের সময় এসব অনেকটাই কমে যাওয়ায় সাময়িকভাবে বাতাসের মান উন্নত হয়। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ওপরের দিকে থাকা ঢাকা ঈদের ছুটিতে কিছুটা হলেও নির্মল বাতাসের স্বাদ পায়। এমনকি গত বছর ঈদের সময় বিশ্বের তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন বায়ুর শহরের তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছিল ঢাকা; যা নগরবাসীর জন্য এক বিরল অভিজ্ঞতা।
ঈদের ছুটিতে ঢাকায় থেকে যাওয়া মানুষদের জন্য এ সময়টা যেন এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে বের হচ্ছেন ঘুরতে। কেউ রিকশায় চড়ে অলস বিকাল উপভোগ করছেন। কেউ আবার খোলা সড়কে হাঁটছেন নির্ভার মনে। যানজটমুক্ত সড়কে চলাচল করা এখন স্বস্তিদায়ক।
মিরপুর থেকে ছেলেকে নিয়ে শপিং করতে আসা বেসরকারি ব্যাংকের চাকরিজীবী তানিয়া ইসলাম বলেন, ‘আমরা যারা ঈদের ছুটিতে ঢাকায় থাকি, এ কয়েকটা দিনই সবচেয়ে ভালো লাগে। শহরটা একেবারে বদলে যায়। দূষণ কম থাকে, রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে। সবমিলিয়ে খুব স্বস্তিতে থাকা যায়।’
শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সড়কে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশের কাছেও এ সময়টা কিছুটা স্বস্তির। যানবাহনের চাপ কম থাকায় দায়িত্ব পালন তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। তবে ফাঁকা শহরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হয়।
রাজধানীর বিজয় সরণিতে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সদস্য রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ সময়ে সড়কে প্রচণ্ড যানজট থাকে। গাড়ির চাপ সামলাতে অনেক বেগ পেতে হয়। কিন্তু ঈদের ছুটিতে যানবাহন কম থাকায় দায়িত্ব পালন অনেক সহজ হয়ে যায়। পরিবেশও সুন্দর থাকে। এ সময় আমরা স্বস্তিতে কাজ করতে পারি। তবে শহর ফাঁকা থাকায় নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়।’
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, ‘যখন সাধারণ মানুষ পরিবার নিয়ে ঈদের আনন্দে মেতে ওঠেন, তখন আমাদের পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন সড়ক, মহাসড়ক ও নগরীর অলিগলিতে। নিজেদের পরিবার থেকে দূরে থেকেও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের অঙ্গীকার।’
নগরবাসীর অনেকেই মনে করছেন, ঢাকার এই সাময়িক পরিবর্তন আসলে একটি বড় বার্তা দেয় যে, যদি যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, দূষণ কমানো যায় এবং নগর পরিকল্পনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে ঢাকা সত্যিকার অর্থেই বাসযোগ্য শহরে পরিণত হতে পারে। ঈদের এই কয়েকদিনের অভিজ্ঞতা সেই সম্ভাবনাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শওকত আলী সুমন বলেন, ‘ঈদের সময় ঢাকাকে একেবারেই ভিন্নরকম লাগে। রাস্তায় কোনো জ্যাম নেই, বাতাস পরিষ্কার। সবই স্বস্তিদায়ক। যদি সারা বছর এমন থাকত, তাহলে ঢাকা সত্যিই বাসযোগ্য শহর হয়ে উঠতে পারত। আসলে সঠিক পরিকল্পনা আর নিয়ন্ত্রণ থাকলে এটা সম্ভব।’
এবারের ঈদে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টানা সাত দিনের ছুটি উপভোগ করছেন। ফলে ২৩ তারিখ পর্যন্ত রাজধানী অনেকটাই ফাঁকা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সময়ে নগরবাসী উপভোগ করবেন শান্ত, নির্মল ও যানজটহীন ঢাকাকে; যা বছরের অন্য সময়গুলোতে কল্পনাই করা যায় না।
