গৃহবধূকে শিকলে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হয় ভাইকে, দুই দিন পর লাশ উদ্ধার
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম
মুক্তা ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা মুক্তা ইসলাম। এই গৃহবধূকে নির্যাতনের একটি ভিডিও তার ভাই তানভীর রহমানের মোবাইল ফোনে পাঠিয়েছিলেন স্বামী সোহেল শিকদার। মেসেজে লিখেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল বাঁধা। তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানো হচ্ছে।
মুক্তার স্বজনরা পরে খিলক্ষেতের বাসায় গিয়ে তাকে আর জীবিত পাননি। গত বৃহস্পতিবার বাসার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, তাকে নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। মৃত্যুর ঘটনায় মুক্তার ছোট ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মুক্তার স্বামীসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ডিএমপির খিলক্ষেত থানার ওসি মো. সোহরাব আল হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, নিহতের স্বামীসহ চারজনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সোহেল শিকদারকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ওসি সোহরাব আল হোসাইন বলেন, সোহেল শিকদার জিজ্ঞাসাবাদে মুক্তাকে মারধরের কথা স্বীকার করলেও যেদিন ফাঁস নিয়েছে সেদিন মারধর করেনি বলে দাবি করেছেন। তিনি (সোহেল শিকদার) বলেছেন- গলায় ফাঁস নেওয়ার দুইদিন আগে স্ত্রীকে মেরেছিলেন সোহেল।
এদিকে মুক্তাকে নির্যাতনের প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিও পেয়েছে পুলিশ। ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। সোহেল চামড়ার বেল্ট দিয়ে তাকে একের পর এক আঘাত করছেন। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ মুক্তা তখন তাকে বলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’
ভিডিওতে মুক্তার শরীরে আঘাতের দাগ দেখা যায়। নির্যাতনের সময় পাশের কক্ষে ছিল তার দুই সন্তান। তাদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’
পুলিশ জানিয়েছে, মুক্তাকে মারধর করার একটি ভিডিও গত ১ সেপ্টেম্বর মুক্তার ভাই তানভীরকে পাঠিয়েছিল সোহেল। ভিডিও পাঠিয়ে তার বোনকে (মুক্তা) নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। দুইদিন পরে তারা মুক্তার মৃত্যুর খবর পান। গ্রেফতারের পর সোহেলের জব্দ করা মোবাইল ফোনেও ভিডিওটি পাওয়া গেছে।
পরিবারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে মুক্তার ভাইয়ের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় মারধর করা হতো- এমন অভিযোগ করছেন পরিবার। শুধু তাই নয়, বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে তার কলহ চলছিল। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ ও যৌতুকের জন্য সোহেল তাকে নির্যাতন করতেন- এমন তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে মুক্তা নির্যাতনের কথা পরিবারকে তেমন কিছুই বলতেন না।
মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা খিলক্ষেতে থাকতেন। সোহেল প্রথমে মুদিদোকান করতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হন। ব্যবসায় ভালো করতে না পারার পর স্ত্রীর সঙ্গে তার মনোমালিন্য বাড়তে থাকে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
