সবজি রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা ও অঙ্গীকার
Advertisement
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিরাপদ ও মানসম্মত সবজির নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সরকারি সংস্থা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা একটি অভিন্ন কর্মপন্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এ উপলক্ষে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে ‘রপ্তানি প্রস্তুতির পথে: বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি খাতের প্রতিবন্ধকতা ও অঙ্গীকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশ। সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান।
বাংলাদেশে বছরে দেড় কোটি মেট্রিক টনের বেশি সবজি উৎপাদিত হলেও এর শূন্য দশমিক ৩ শতাংশেরও কম রপ্তানি হয়। আলোচনায় উঠে আসে, রপ্তানির প্রতিবন্ধকতা শুধু উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। বালাই ও কীটনাশক ব্যবস্থাপনা, ক্রেতার কাছে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষা ও সনদায়ন, ট্রেসেবিলিটি, লজিস্টিকস এবং রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সমন্বয়ের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে গার্ডজাতীয় সবজির চালান ইউরোপের বাজারে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় শুধু সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, উৎস বাজার হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থাও কমে।
এসজিএস বাংলাদেশ পরিচালিত একটি বাজার সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা বিশ্লেষণ করেন, কোন কোন পর্যায়ে রপ্তানি চালান প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারায় বা কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত বাধার মুখে পড়ে। আলোচনায় উচ্চ উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয়, আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ, কাস্টমস ও বিমানবন্দরে পণ্য ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব, দুর্বল মোড়কীকরণ ও ব্র্যান্ডিং, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ জনিত ঝুঁকি, দুর্বল ট্রেসেবিলিটি, ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ সনদায়ন প্রক্রিয়া, বিক্ষিপ্ত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং মূল্য শৃঙ্খলজুড়ে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়গুলো উঠে আসে।
আলোচনায় একটি অভিন্ন কর্মপন্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ জনিত ঝুঁকি কমাতে খেত পর্যায়ে কমপ্লায়েন্স ও ট্রেসেবিলিটি জোরদার করা জরুরি বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সবজিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে মোড়কীকরণ, লজিস্টিকস, পরীক্ষা ও সনদায়ন ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
উন্নত বাজার তথ্য, রপ্তানি গন্তব্যের বৈচিত্র্য, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং রপ্তানিকারকদের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আর্থিক সেবার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আমিরুল বাহরাইন বলেন, কীটনাশকের বিষাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী রঙভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা থাকলেও খেত পর্যায়ে সঠিকভাবে কীটনাশক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে শুধু ভালো মানের পণ্যই যথেষ্ট নয়; প্রতিযোগিতামূলক মোড়কীকরণ ও উপস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক মো. আব্দুল মজিদ প্রামানিক দুর্বল বাজারতথ্য, উচ্চ ও অনিশ্চিত আকাশপথের পরিবহন ব্যয়, অপর্যাপ্ত লজিস্টিকস, সীমিত সমন্বয় এবং দুর্বল ট্রেসেবিলিটিকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে তিনি রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য, উন্নত লজিস্টিকস, খেত পর্যায়ে শক্তিশালী ট্রেসেবিলিটি, কার্যকর সমন্বয় এবং রপ্তানি সংশ্লিষ্ট কর-সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেন।
রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোবাশ্বেরুর রহমান জুয়েল বলেন, আকাশ পথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ছে। উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা এবং বিদ্যমান রপ্তানির পরিমাণ ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
অর্থায়ন প্রসঙ্গে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির চিফ অব ব্রাঞ্চ বিজনেস অ্যান্ড হেড অব অপারেশনস হেলাল আহমেদ বলেন, কৃষি রপ্তানি খাতে যুক্ত রপ্তানিকারক, কৃষক, পরামর্শক এবং অন্যান্য অংশীজনের প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দিতে ব্যাংক প্রস্তুত রয়েছে।
আলোচনায় আরও বলা হয়, রপ্তানি প্রস্তুতিকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি উদ্যোগ হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। খেত পর্যায়ের উৎপাদনচর্চা, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ সংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স, ট্রেসেবিলিটি, সনদায়ন, মোড়কীকরণ, লজিস্টিকস, বাজারতথ্য এবং অর্থায়ন—সবকিছু মিলেই নির্ধারণ করে একটি রপ্তানি চালান কতটা প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্যভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারবে।
সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশরাত ফাতেমা বলেন, বাংলাদেশের জমি আছে, অনুকূল জলবায়ু আছে, কৃষকও আছেন। কিন্তু এখনও এমন একটি কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, যার ওপর ক্রেতা পণ্য হাতে পাওয়ার পরও আস্থা রাখতে পারেন। সেই ব্যবস্থার প্রতিটি অংশ এই ঘরের কোথাও না কোথাও রয়েছে। আজকের আলোচনা ছিল অনুপস্থিত প্রতিটি অংশের সঙ্গে দায়িত্বশীল একটি নাম যুক্ত করার প্রয়াস।
এ ধরনের উদ্যোগ সুইসকন্ট্যাক্টের কাজের পদ্ধতিরই প্রতিফলন। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প হিসেবে কাজ না করে প্রতিষ্ঠানটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রপ্তানিকারক সমিতি ও পরীক্ষা সেবাদাতাদের সঙ্গে কাজ করে মূল্যশৃঙ্খলের ভেতরেই কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চায়, যাতে বাহ্যিক সহায়তা শেষ হওয়ার পরও নিরাপদ উৎপাদনচর্চা টেকসই থাকে। একই ব্যবস্থা একদিকে রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে পারে, অন্যদিকে দেশের ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ সবজি এবং কৃষকদের জন্য ভালো আয় নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।
গোলটেবিল বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও এর উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিএফভিএপিইএর সদস্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটি আয়োজনে সহায়তা করে স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড ট্রেড ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটি (এসটিডিএফ), আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি এবং অস্ট্রেলিয়া সরকার। জ্ঞান অংশীদার হিসেবে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিক্স স্টাডি সেন্টার।
