রাজশাহীর ৩টি আসনে মাঠ ছাড়েননি মনোনয়ন বঞ্চিতরা, প্রার্থী বদলের দাবি
Advertisement
আনু মোস্তফা, রাজশাহী
প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৪৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহীর তিনটি সংসদীয় আসনে মনোনীত প্রার্থী বদলের দাবিতে মাঠ ছাড়ছে না মনোনয়ন বঞ্চিতদের অনুসারী নেতাকর্মীরা। রাজশাহীর ৬টি আসনের মধ্যে তিনটি আসনে মনোনয়ন বদলের দাবিতে দলের একাংশের নেতাকর্মীরা লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছেন।
এর মধ্যে দুটি আসনের মনোনয়নবঞ্চিতরা মহাসড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচির দিকে যাচ্ছেন। ফলে রাজশাহীর এসব আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা দলের একাংশের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে ঠিকমতো গণসংযোগেও মাঠে নামতে পারছেন না।
এসব আসনে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিরাজমান অচলাবস্থা কাটাতে দ্রুত কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। প্রার্থী বদলের দাবিতে গত ৪ নভেম্বর কোথাও মশাল মিছিলসহ বিক্ষোভ হচ্ছে কোথাওবা হচ্ছে সড়ক অবরোধ আবার কোথাও কাফনের কাপড় পরে সড়কে শুয়ে পড়ছেন বঞ্চিত প্রার্থীদের অনুসারী নেতাকর্মীরা।
জানা গেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বিভিন্ন আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের কেন্দ্রে ডেকে ডেকে সমঝোতার পরামর্শ দিচ্ছেন। মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামতে নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু তাতে পরিস্থিতির বিশেষ হেরফের হচ্ছে না।
রাজশাহীর যে তিনটি আসনে মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির প্রার্থীদের অনুসারী নেতাকর্মীরা লাগাতার বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন- রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসন সেগুলোর একটি। এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছেন দলটির প্রয়াত নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিনকে।
শরিফ উদ্দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সামরিক সচিব ছিলেন। ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের মৃত্যুর পর থেকেই জেনারেল শরিফ গোদাগাড়ী-তানোর এলাকায় আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। রাজশাহী-১ আসনের গোদাগাড়ী এই বিএনপি প্রার্থীর নিজের এলাকা। শরিফ বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হক দলমত নির্বিশেষে এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি দলমত নির্বিশেষে সবার জন্যই কাজ করতেন। শরিফের মূল ভরসা ভাই ব্যারিস্টার আমিনুল হকের অবশিষ্ট জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া।
দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, জেনারেল শরিফ গত দুই বছর ধরে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে মাঠে আছেন গণসংযোগে।
নেতাকর্মী আরও বলছেন- জেনারেল শরিফ রাজশাহী-১ আসনে একজন শক্তিশালী প্রার্থী। তাকে হটানো সহজ নয়।
রাজশাহী-১ গোদাগাড়ী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নওশাদ আলী বলেন, বিএনপি প্রার্থী শরিফ উদ্দিনের সঙ্গে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরাই মাঠে আছেন। প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হকের প্রতি গোদাগাড়ী-তানোরের মানুষের বিশেষ কৃতজ্ঞতা রয়েছে। কারণ ব্যারিস্টার সাহেব বরেন্দ্রভূমির এই এলাকাগুলোতে যে উন্নয়ন করেছিলেন তার সুফল এখনো মানুষ ভোগ করছেন। একজন মনোনয়ন বঞ্চিতের কিছু অনুসারী প্রার্থী বদলের দাবি করলেও সে সম্ভাবনা খুবই কম। বরং কেন্দ্রের উচিৎ মনোনয়ন বঞ্চিতের ডেকে মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বলা।
এতে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে ঐক্য যেমন আরও সুদৃঢ় হবে তেমনি নির্বাচনে প্রার্থীর জয় সুনিশ্চিত হবে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা শরিফকে প্রার্থী হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী-১ আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত অ্যাডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেকের অনুসারীরা মনোনয়ন বদলের দাবিতে লাগাতার কর্মসূচি পালন করছেন। গত শনিবার বিকালে তারেকের অনুসারীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে কাফনের কাপড় পরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। এর আগেও একাধিকার তারেক অনুসারীরা মহাসড়কে শুয়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন।
তারেক অনুসারীদের দাবি- এ আসনে শরিফ উদ্দিন প্রার্থী থাকলে জামায়াতের প্রার্থী মজিবুর রহমানের জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের আরও দাবি জেনারেল শরিফ আগে কোনোদিন রাজনীতিতে ছিলেন না। তিনি মাঠের রাজনীতি ভালো বুঝতে পারছেন না। প্রার্থী বদল হলে আসনটি বিএনপির ঘরে যাবে। তারাও এ বিষয়ে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ চাইছেন।
রাজশাহী-১ আসনে মনোনয়নবঞ্চিত গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেক জানান, প্রার্থী বদলের দাবিতে দলীয় নেতাকর্মীরা আন্দোলনে নামলে আমি তাদের নিবৃত করতে পারি না। কারণ যারা প্রার্থী বদলের দাবি করছেন তারাও বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। দলের প্রতি তাদেরও গভীর আনুগত্য রয়েছে। তারা দলকে ভালোবাসেন। তারা দলের এমন প্রার্থী চাইছেন যিনি এলাকায় বেশি জনপ্রিয়। আমি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও তাদের সঙ্গে থাকব। আমি এটাও আশা করি প্রার্থী বদল করে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে।
অন্যদিকে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনেও প্রার্থী বদলের দাবিতে বিক্ষোভ অবরোধ ও মানববন্ধন কর্মসূচি চলছে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রায়হানুল হকের অনুসারী নেতাকর্মীরা স্থানীয় প্রার্থীর দাবি জানিয়ে প্রার্থী বদলের আন্দোলন জোরদার করেছেন। গত শনিবার বিকালেও মনোনয়নবঞ্চিত রায়হানুল হকের অনুসারীরা খড়খড়ি বাজারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। তারা মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনকে বহিরাগত হিসেবে উল্লেখ করে তার মনোনয়ন বাতিলের দাবি করে আসছেন।
এছাড়া এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী কবীর হোসেনের ছেলে নাসির হোসেনের অনুসারীরাও পৃথকভাবে রাজশাহী-৩ আসনের প্রার্থী বদলের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোনয়নবঞ্চিত রায়হানুল হক বলেন, এলাকার দলীয় নেতাকর্মীসহ এলাকাবাসী চায় তাদের সংসদ সদস্য হবেন তারই প্রতিবেশী কেউ। আমি এলাকার মানুষ। দীর্ঘদিন জেল জুলুম হুলিয়া নির্যাতনের শিকার হয়েও নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিলাম। এছাড়া লোকজন মনে করেন বিপদ আপদে যাকে কাছে পাওয়া যাবে তাকেই প্রার্থী করা প্রয়োজন। দলের নেতাকর্মীরা এ কারণে রাজশাহী-৩ আসনে প্রার্থী বদলের দাবিতে অনড় আছেন।
এদিকে রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে এবার সর্বাধিক সংখ্যক ১২ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। গত ৩ নভেম্বর নজরুল ইসলাম মণ্ডলকে বিএনপি প্রার্থী করেন। এরপর থেকেই মনোনয়নবঞ্চিত অধিকাংশ প্রার্থীর অনুসারীরা নজরুল ইসলাম মণ্ডলের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
প্রার্থী বদলের দাবিতে এ আসনে মনোনয়নবঞ্চিত আবু বকর সিদ্দিক, যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গোলাম মোস্তফা, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রোকনুজ্জামান আলম, পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ইসফা খাইরুল হক ও এ আসনের সাবেক এমপি প্রয়াত নাদিম মোস্তফা ছেলে জুলকার নাইম মোস্তফার অনুসারী নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করে আসছেন। তারা প্রায় প্রতিদিনই রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করছেন। এলাকায় এলাকায় মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন।
মনোনয়নবঞ্চিতরা গত শনিবার দুর্গাপুরে একমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রার্থী বদলের দাবিতে সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। এ আসনে প্রার্থী বদল না হলে বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকারও ঘোষণা দিয়েছেন।
দলীয় নেতাকর্মীরা আরও জানান, রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নেতাকর্মী সংকটে মাঠে গণসংযোগ ও প্রচার প্রচারণা জমিয়ে তুলতে পারছেন না। আসনের কোনো কোনো এলাকায় গণসংযোগে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ছেন। তবে এ আসনে মনোনয়নবঞ্চিত আব্দুস সাত্তার ও মাহমুদা হাবিবার অনুসারী নেতাকর্মীরা দল মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মণ্ডলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন।
এ বিষয়ে মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আবু বকর সিদ্দিক বলেন, দীর্ঘদিন নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন, জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করে যারা দলের নেতাকর্মীদের ধরে রেখেছিলেন, আমরা চেয়েছিলাম তাদের কাউকে রাজশাহী-৫ আসনে দল মনোনয়ন দিক; কিন্তু সেটা হয়নি। সেটা না করে নেতাকর্মীবিমুখ ও জনবিচ্ছিন্ন একজনকে এ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এটা দলের নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না। এ কারণে প্রার্থী বদলের আন্দোলনটা এখানে বেশি হচ্ছে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখনো আশা করেন দল নিরপেক্ষ জরিপের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা যাচাই করে যোগ্য ও উপযুক্ত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবেন। দলকে নেতাকর্মীদের মনের ভাষা বুঝতে হবে।
