কটূক্তি-হয়রানি-বৈষম্য
তৃতীয় লিঙ্গের ভোটাররা যাবেন না ভোটকেন্দ্রে
Advertisement
আনু মোস্তফা, রাজশাহী
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভোট কেন্দ্রে তারা নারী বুথে গিয়ে ভোট দেবেন নাকি পুরুষ বুথে যাবেন- এমন কোনো নির্দেশনা ও ব্যবস্থা নেই। এছাড়া কটূক্তির বিড়ম্বনা তো রয়েছেই। তাদের দেখলেই শুরু হয় হয়রানি। এমন অনকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনের তৃতীয় লিঙ্গের ভোটাররা এবার আর ভোট কেন্দ্রে যাবেন না। দেবেন না ভোট। যদিও তাদের অনেকেই বৈধ ভোটার। তাদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) আছে। এই বিভাগের তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন জেলায় সংগঠন রয়েছে। তারা সাংগঠনিকভাবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে এবার ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রাজশাহীতে দিনের আলো হিজড়া নামের একটি বড় সংগঠন রয়েছে তাদের। শতাধিক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এই সংগঠনটির সদস্য। ২০২৩ সালের জুনে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১৯, ২০ ও ২১নং সংরক্ষিত ওয়ার্ডে বিপুল ভোটে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন এই সংগঠনের নেত্রী সাগরিকা। এবার তিনিও ভোট কেন্দ্রে যাবেন না।
রাজশাহীর মিস পূর্ণিমার বয়স ৩৭। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম মারুফ। নিজেদের মধ্যে তার আসল পরিচিতি পূর্ণিমা নামে। রাজশাহী মহানগরীর ৩নং ওয়ার্ডের ভোটার তিনি। ২০১৮ সালে এনআইডি পেয়ে ভোটার তালিকাভুক্ত হন। ২০১৮ সালে ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলেন। ভোট না দিয়েই ফিরে আসেন। এরপর আর কোনো নির্বাচনেই ভোট দিতে যাননি। তার মতে, তৃতীয় লিঙ্গের অনেকেই সেবার ভোট দিতে গিয়ে কটূক্তি ও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন।
মিস পূর্ণিমা আরও বলেন, সমাজের চোখে আমরা যেন চিড়িয়াখানার জীবজন্তুর মতো একটা কিছু। লোকজন আমাদের দেখলে বাঁকা চোখে তাকায়। সবচেয়ে বড় কথা-আমরা নারীদের বুথে নাকি পুরুষের বুথে লাইনে দাঁড়াব, তার কোনো নির্দেশনা নেই। নারীদের লাইনে দাঁড়াতে গেলে নারীরা অচ্ছুৎ ভেবে আমাদের থেকে দূরে সরে যান। পুরুষের বুথে গেলে পুরুষরা তাড়িয়ে দেন।
মিস বিজলির বয়স ২৯ বছর। বেশ কয়েক বছর আগে নওগাঁর গ্রাম থেকে রাজশাহী শহরে এসে তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের সঙ্গে বসবাস করেন। এনআইডি আছে আবার ভোটারও হয়েছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার একটি কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। নারীদের লাইনে দাঁড়ালে ওই লাইনের নারীরা মিলে তাকে লাইন থেকে বের করে দেন। ডিউটিরত পুলিশকে বলেও ভোট কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকতে পারেননি। শেষে ভোট না দিয়েই ফেরেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃতীয় লিঙ্গের এক ভোটার বলেন, আমাদের বেশভূষা, পোশাক পরিচ্ছদ নারীদের মতো হলেও জন্ম পরিচয়ে সবারই এনআইডির নাম হয় পুরুষ লিঙ্গের। হিজড়া সমাজে গিয়ে নাম হয় নারীদের নামে। পুরুষ বুথে ভোট দিতে গেলে আমাদের ভোট নেওয়া হয় না। আমাদের শরীরে পোশাক থাকে নারীর। পুরুষদের লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম একবার। সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর আমরা আর ভোট কেন্দ্রে যাই না। আমাদের সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিক পরিবেশ নেই।
রাজশাহীর নারী আইনজীবী আইরিন সুলতানা বলছিলেন, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত হওয়ায় তারা ভোটারও হতে পারেন; কিন্তু ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তাদের নানান সামাজিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়। হিজড়াদের বিষয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের ট্যাবু আছে। অনেকের অস্বস্তি কাজ করে। তাদের দেখলেই ঘৃণামূলক কটূক্তি করেন। ফলে হিজড়ারা কেউ ভোট দিতে আগ্রহ দেখান না। যদিও তাদের অনেকেই বৈধ ভোটার। তাদের জন্য পৃথক পোলিং বুথ থাকা উচিত।
রাজশাহীতে তৃতীয় লিঙ্গের সংগঠন দিনের আলো হিজড়া সংঘ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগর ও জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় এক হাজার ২১১ জন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রয়েছেন। তাদের অনেকেই ভোটার হয়েছেন। তবে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। এর কারণ সামাজিক অস্বস্তি, হয়রানি ও বিড়ম্বনা।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য মতে, এ অঞ্চলের মোট সংসদীয় আসন ৩৯টি। এসব আসনে এবার তৃতীয় লিঙ্গের হালনাগাদ ভোটারের সংখ্যা ১৭২ জন। অনেকেই ভোটার হালনাগাদ করেননি।
আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের জন্য পৃথক কোনো বুথ থাকছে না এবারও। নারী বা পুরুষ যেকোনো লাইনে দাঁড়িয়ে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
রাজশাহীর তৃতীয় লিঙ্গের শাবনুরের এনআইডির নাম জনি হোসেন। নগরীর ১নং ওয়ার্ডের ভোটার শাবনুর। বলছিলেন তারা কেউ ভোট দিতে যাবেন না। আগেরবার ভোটার ছিলেন। এবার ভোটার তালিকায় নাম আছে কিনা জানেন না।
তিনি আরও জানান, আমাদের অনেকেই এনআইডি করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন। ফলে অনেকেই হালনাগাদ ভোটার তালিকায় নাম তোলেননি। আমাদের অনেকেই ভোট কেন্দ্রে গিয়ে কটূক্তি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাই এবার কেউ আর ভোট কেন্দ্রে যাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জেলার নওহাটার মিস রাত্রির এনআইডির নাম রাহাত উদ্দিন। গত নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে নারী পুরুষ সকলেরই বাধার মুখে পড়েন। শেষে ভোট না দিয়েই ফিরতে হয়।
রাত্রি আরও বলেন, আমাদের পোশাক পরিচ্ছদ, চলনভঙ্গি ও পরিচয়ের কারণে আমাকে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সঠিক তথ্য দেয়নি কেউ কোনো লাইনে গিয়ে দাঁড়াব, কোনো কক্ষে গিয়ে ভোট দেবো। শেষ পর্যন্ত চরম হয়রানির শিকার হয়ে ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরে আসি। তাই এবার আর ভোট দিতে যেতে চাই না।
এই বিষয়ে রাজশাহী দিনের আলো হিজড়া সংঘের সভাপতি মোহনা মুহিন বলেন, আমাদের ভোটার করা হয়েছে বটে তবে ভোটকেন্দ্রগুলি তৃতীয় লিঙ্গবান্ধব নয়। সেখানে আলাদা লাইন এবং বুথ থাকে না। কেন্দ্রে যারা ভোট গ্রহণ করেন তাদেরও এই বিষয়ে কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। তৃতীয় লিঙ্গের কেউ ভোট দিতে গেলে তারা অনীহা দেখান। ফলে আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সাংবিধানিক অধিকার বঞ্চিত হচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, যে কেন্দ্রে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছে সেখানে পৃথক বুথ বা ব্যবস্থা, ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের সংবেদনশীলতা দরকার। পাশাপাশি হয়রানি প্রতিরোধে ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু কোথাও আমাদের এসব ব্যবস্থা নেই। ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার কেউ ভোট দিতেই যাব না।
তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর নাহিদা পারভিন বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও। এ ব্যাপারে সময় মতো যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণে তাদের মতামত প্রদান নিশ্চিত হবে। তাদের অংশগ্রহণও বাড়বে।
