Logo
Logo
×
   

Advertisement

সারাদেশ

লেছড়াগঞ্জ বালুমহাল: রাজস্ব নয়, সমঝোতার খেলা

Advertisement

মতিউর রহমান

মতিউর রহমান

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

লেছড়াগঞ্জ বালুমহাল: রাজস্ব নয়, সমঝোতার খেলা

ছবি: যুগান্তর

Advertisement

মানিকগঞ্জে বালুমহাল ইজারা প্রক্রিয়া আবারও প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি না করে সমঝোতার অভিযোগে ভর করছে বাংলা ১৪৩৩ সনের হরিরামপুরের লেছড়াগঞ্জের বালুমহালের দরপত্রে। কম দর দেখিয়ে সরকারের কোটি টাকার রাজস্ব বিঘ্নিত করার এক সুপরিকল্পিত নীলনকশার আভাস মিলেছে পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে।

জেলার হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের সরকারি ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয় সাত কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। অথচ দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা খান এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় মাত্র দুই কোটি ২০ লাখ টাকা; যা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৭০ দশমিক ৩৩ শতাংশ কম।

গত ২৯ মার্চ দরপত্র উন্মুক্তের দিন জেলা প্রশাসক ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা স্পষ্ট ভাষায় জানান, সরকারি মূল্যের তুলনায় এত কম দর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দর খোলার সময় তার অসন্তোষও ছিল প্রকাশ্য। যা পুরো প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে দরপত্র স্থগিত করেন এবং পুনরায় আহ্বানের ঘোষণা দেন।

তথ্য বলছে, এই বালুমহালের জন্য ১৪টি সিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র ৩টি। অংশ নেয় খান এন্টারপ্রাইজ, সজিব করপোরেশন ও জমিদার এন্টারপ্রাইজ। বাকি ১১টি সিডিউল রহস্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। 

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র সম্ভাব্য দরদাতাদের মাঠের বাইরে রেখে প্রতিযোগিতা সীমিত করেছে। ফলে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর নামিয়ে আনার পথ তৈরি হয়।

লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের দরপত্র ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। ১৪৩০ বাংলা সনে যার মূল্য ছিল চার কোটি ৩ লাখ টাকা, পরের বছরই তা লাফিয়ে ওঠে ১১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ১১১ টাকায়। সে সময় ইজারা পায় আওয়ামী লীগ নেতা আবিদ হাসান বিপ্লবের প্রতিষ্ঠান এশিয়ান বিল্ডার্স। কিন্তু ১৪৩২ বাংলা সনে হঠাৎ রাজস্ব নেমে আসে পাঁচ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৯ টাকায়, অর্থাৎ প্রায় ৫২ দশমিক ০৯ শতাংশ কমে। ইজারা পায় মিথিলা এন্টারপ্রাইজ, তাদের প্রস্তাব ছিল ৫ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকা। আর এবার ১৪৩৩ বাংলা সন দর নেমে আসে ২ কোটির ঘরে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, একই মহালের বাজারমূল্য কি এত দ্রুত কমে যেতে পারে, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবেই তা নামিয়ে আনা হচ্ছে?

অভিযোগের তীর এবার প্রশাসনের ভেতরেও। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার বাইরে বালু উত্তোলনের লিখিত অভিযোগ থাকলেও তা রহস্যজনকভাবে থেমে যায়। কার্যত কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ইজারাদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চৌহদ্দি উপেক্ষা করে পছন্দের স্থানে বালু উত্তোলন চলে প্রকাশ্যেই। 

স্থানীয়দের অভিযোগে, সরকারের রাজস্ব হ্রাস প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রশাসনিক ছায়া ও রাজনৈতিক মদদ। ফলে রাজস্ব আদায়ের বদলে একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই যেন হয়ে উঠেছে মূল লক্ষ্য। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দরপত্রকে কেন্দ্র করে সমঝোতার একটি চক্র সক্রিয়, যারা পরিকল্পিতভাবে দর কমিয়ে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পথ তৈরি করছে। প্রথম দফার দরপত্র বাতিল হলেও একই কৌশল পুনরায় প্রয়োগের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল। 

এ ব্যাপারে রোববার ২৯ মার্চ দরপত্র উন্মুক্তের সময় জেলা প্রশাসক ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, লেছড়াগঞ্জ বালুমহালে সরকারি মূল্য ছিল সাত কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। এই বালুমহালে মোট তিনটি সিডিউল জমা পড়েছে। এরমধ্যে খান এন্টারপ্রাইজ দর দিয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা, জমিদার এন্টারপ্রাইজ দর দিয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সজিব করপোরেশন সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি কমমূল্য থাকায় দরগুলো গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য আমরা এই বালু মহালে সেকেন্ড দরপত্রে যাচ্ছি। 

তিনি বলেন, বিধি অনুযায়ী আমরা বালুমহাল ইজারা দিয়েছি। ইজারা দেওয়ার পর যদি কোনো ঠিকাদার নির্দিষ্ট সীমারেখার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করেন তাহলে সরকারি বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম