দীর্ঘ ৬৪ কিমি ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন, মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা
শাহজাহান সিরাজ মিঠু, জয়পুরহাট
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম
দীর্ঘ ৬৪ কিমি ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন, মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রেললাইনের নানা স্থানের কংক্রিটের স্লিপার ভাঙা, নেই প্যান্ড্রল ক্লিপ, কোথাও কোথাও বৃষ্টি হলেই রেললাইনের নিচে জমে থাকে পানি। বগুড়ার সান্তাহার রেলওয়ে জংশন স্টেশনের রেলগেট (রেলের ভাষায় ‘পোটার গেট’) থেকে উত্তরের জেলা দিনাজপুরের বিরামপুর রেলগেট পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৬৪ কিলোমিটার অংশের রেললাইনের এ অবস্থা।
আর এমন নাজুক অবস্থাতেই জয়পুরহাটের ওপর দিয়ে এখন মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে মাল (পণ্য) ও যাত্রীবাহী দূরপাল্লার আন্তঃনগরসহ সব ধরনের ট্রেন। ফলে এ রেলপথে যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত মারাত্মক দুর্ঘটনা, হতে পারে প্রাণহানিসহ মূল্যবান সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।
গত ১৮ মার্চ পবিত্র ঈদুল ফিতরের মাত্র দুই দিন আগে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে এই পথের আদমদীঘির বাগবাড়ি এলাকায় ঘটেছিল আকস্মিক এক দুর্ঘটনা। প্রাণহানি না ঘটলেও ওই দুর্ঘটনায় দেড় শতাধিক যাত্রী আহত হন। এতে সারা দেশের সঙ্গে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা বন্ধ ছিল রেল যোগাযোগ।
ওই দুর্ঘটনার পর থেকে এখনো বাগবাড়ির ওই দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে প্রতিটি ট্রেন ধীরগতিতে যাতায়াত করছে। রেলপথের উল্লেখিত ৬৪ কিলোমিটার অংশের কয়েকশ কংক্রিটের স্লিপার ভেঙে রয়েছে, অথচ নেওয়া হয়নি সেগুলো মেরামতের উদ্যোগ। এ অবস্থায় যেকোনো সময় আদমদীঘির বাগবাড়ি এলাকার মতো লাইনচ্যুত হয়ে বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনার আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর।
পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরের বিরামপুর রেলগেট থেকে বগুড়ার সান্তাহার পোটার রেলগেট পর্যন্ত ৬৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার রেলপথে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে প্রায় ডজনখানেক যাত্রীবাহী আন্তঃনগর, মেইল ও মালবাহী ট্রেন।
এ রেলপথের মধ্য জয়পুরহাট জেলার তিলকপুর, জামালগঞ্জ, পাঁচবিবি ও বাগজানা এবং দিনাজপুরের বিরামপুর ও হাকিমপুর উপজেলার হিলি অংশে রেললাইনের কয়েকশ কংক্রিটের স্লিপার ভেঙে ভেতরের রড বের হয়ে আছে। অনেক জায়গায় রেললাইন আটকানোর প্যান্ড্রল ক্লিপও নেই। আবার রেললাইনের জোড়াগুলোর অবস্থাও দুর্বল-নড়বরে হয়ে গেছে। রেললাইনের কোথাও কোথাও পানি জমে থাকায় চলাচলের সময় ট্রেনের ভার ও চাপে ওই স্থানের রেললাইন ওঠানামা করে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, জয়পুরহাটের সীমান্তবর্তী পাঁচবিবি উপজেলার কোকতারা গ্রামের রেললাইনের অন্তত ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কংক্রিটের স্লিপার দীর্ঘদিন থেকে ভেঙে রয়েছে। এখন পর্যন্ত সেগুলো মেরামত করা হয়নি।
ওই রেললাইনের পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থানীয়রা জানান, কেবল রেললাইনের কংক্রিটের স্লিপার নষ্ট হয়নি, একটুখানি বৃষ্টিপাত হলেই ওই রেললাইনের নিচে বৃষ্টির পানি জমে। ট্রেন চলাচলের সময় ওই জায়গা দেবে যায়। তখন ট্রেনের প্রেসারে লাইনটি তখন উঠানামা (আপ-ডাউন) করে। এমনি অবস্থায় অনেক সময় ওই লাইনের নিচে বস্তা দিয়েও ট্রেন পার করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, রেল বিভাগের পক্ষ থেকে আগের মতো এখন রেললাইনের পাথরগুলো পরিষ্কার করা হয় না। সে কারণে একটু বৃষ্টিপাত হলেই রেললাইনের পাথরগুলো দেবে যায়।
সংশ্লিষ্ট রেল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ার সান্তাহার পোটার রেলগেট থেকে দিনাজপুরের বিরামপুর রেলগেট থেকে পর্যন্ত ৬৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার রেললাইন দেখভাল করার জন্য যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন তার অর্ধেকেরও বেশি পদ দীর্ঘদিন থেকে শূন্য রয়েছে, লোক নেই। উপসহকারী প্রকৌশলী পদেও লোক নেই। কি-ম্যানের ১০টি পদও শূন্য (খালি) দীর্ঘদিন থেকে। অথচ এই কি-ম্যানদের দায়িত্ব হলো প্রতিদিন সকাল ৭টার মধ্যেই রেললাইন চেক করে রিপোর্ট প্রদান করা। যে দায়িত্ব পালন করছেন অন্য পদের লোকজন। আবার ৪ জন ট্রলিম্যানের বিপরীতে আছে মাত্র ১ জন। ৩ জন নিরাপত্তা কর্মীর মধ্যে আছে ১ জন। ২ জন বেলোম্যানের দুটি পদই শূন্য আছে দীর্ঘদিন থেকে। হেমারম্যান থাকার কথা ৩ জন। আছে মাত্র ১ জন। প্রয়োজনীয় জনবল সঙ্কটের কারণে অনেক সময় রেললাইন মেরামতের কাজে বিলম্ব ঘটে বলে দাবি ওই সূত্রটির।
জয়পুরহাট জেলার ওপর দিয়ে স্থাপিত রেললাইনের বর্তমান হাল হকিকত (অবস্থা) সম্পর্কে জানতে চাইলে ঈশ্বরদীর পাকশী রেলওয়ে বিভাগের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) ভবেশ চন্দ্র রাজবংশী বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা মোকাবেলা করে আমরা যাত্রীদের ট্রেনযাত্রা নিরাপদ করার জন্য কাজ করছি। ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ সার্বক্ষণিক পরিদর্শনসহ স্থায়ীভাবে সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যেই ৩টি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই কাজ শুরু হবে। তখন ট্রেন চলাচল নিয়ে সব ধরনের শঙ্কা কেটে যাবে।
