মোটর শ্রমিকদের দুপক্ষের বোমাবাজি
চার বছর আগে খুন হওয়া কিশোরও মামলার আসামি
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম
বোয়ালিয়া মডেল থানা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী বাস টার্মিনালে শ্রমিক দলভুক্ত জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপি সমর্থিত দুই দল শ্রমিকের মধ্যে দফায় দফায় মারধর, সংঘর্ষ ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে দুইপক্ষের বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
এদিকে এ ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় চার বছর আগে খুন হওয়া কিশোরকেও আসামি করা হয়েছে।
জানা গেছে, রাজশাহী বাস টার্মিনালে শ্রমিক দলভুক্ত জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপি সমর্থিত দুই দল শ্রমিকের মধ্যে গত ২২ এপ্রিল শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় ঘটে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও মারধরের ঘটনা। জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ও মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম পাখিকে এদিন মারধর করে তার কার্যালয়টিতে তালা দেন প্রতিপক্ষের শ্রমিকরা।
এ ঘটনার জের ধরে গত ২৩ এপ্রিল জেলা মোটর শ্রমিক নেতা পাখির অনুসারীরা সংগঠিত হয়ে চারদিক থেকে বাস টার্মিনাল ঘেরাও দিয়ে প্রতিপক্ষের শ্রমিকদের বিতাড়ন করেন এবং তার কার্যালয়টি দখলমুক্ত করেন। এ নিয়ে ঘটনার দিন দুইপক্ষই টার্মিনাল এলাকায় ব্যাপক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। ওই দিন বিকাল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত শিরোইল এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ সংঘর্ষে দুইপক্ষের বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জানা গেছে, এ ঘটনার পর গত ২৪ এপ্রিল মো. শাজাহান আলী নামের একজন শ্রমিক বাদী হয়ে আরএমপির বোয়ালিয়া মডেল থানায় হামলা ভাঙচুর অস্ত্র প্রদর্শন গুলি ও বোমাবাজির অভিযোগে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। বাদী শাজাহানের বাড়ি নগরীর সুলতানাবাদ এলাকায়। তিনি শ্রমিক দলের সদস্য মোটর শ্রমিক। ওই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে জেলা মোটর শ্রমিক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম পাখিসহ শতাধিক ব্যক্তিকে। মামলার ৩ নাম্বার আসামি করা হয়েছে পাখির ছেলে সানিকে (১৭)।
এদিকে নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, ২০২২ সালের ৩ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে অসুস্থ বন্ধুকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার সময় কিশোর গ্যাঙের সদস্যরা ৩ নাম্বার আসামি সানিকে অপহরণ করে। পরে নগরীর হেতেমখা সবজিপাড়ায় নিয়ে তাকে ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে হত্যার পর একটি ড্রেনে ফেলে রাখে। পূর্বশক্রতার জের ধরে সানিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে কিশোর গ্যাঙের সন্ত্রাসীরা।
পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, সানি নিহত হওয়ার সময় মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল। সানি হত্যা মামলাটির চার্জশিট হয়েছে ২০২৩ সালে এবং মামলাটি বর্তমানে মহানগর যুগ্ম-জজ আদালতে বিচারাধীন আছে।
সানি হত্যার ঘটনাটি ওই সময় রাজশাহী নগরীতে কিশোর গ্যাঙের লাগামহীন অপতৎপরতা নগরবাসীর সামনে আসে।
অন্যদিকে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বাস টার্মিনাল দখল নিয়ে হামলা-পালটা হামলায় দায়ের করা মামলার এজাহারে বাদী দাবি করেছেন- অন্য আসামিদের সঙ্গে গত ২৩ এপ্রিল তিন নম্বর আসামি (যদিও মৃত) সানি (১৭) বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেন। সানি নিজেই কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটায় এবং ঘটনাস্থলে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এমনকি সানি অস্ত্র হাতে বাদীকে ধাওয়া করেছে।
প্রায় চার বছর আগে নিহত একজন কিশোর গত ২৩ এপ্রিল কীভাবে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অস্ত্র হাতে তাকে ধাওয়া করেছে- জানতে চাইলে বাদী মো. শাজাহান আলী বলেন, সবাই মিলে আসামির নাম বসাতে গিয়ে গোলমাল হয়ে গেছে। সানি কয়েক বছর আগেই কিশোর গ্যাঙের হাতে নিহত হয়েছে বলে পুলিশ আমাকে জানিয়েছে। আমি পুলিশকে বলেছি ওই নামটা বাদ দিয়ে এজাহার ঠিক করে দিতে।
চার বছর আগে নিহত কিশোরের নাম বিস্ফোরক মামলার তিন নম্বরে থাকলেও পুলিশ মামলা রেকর্ডের আগে কেন প্রাথমিক খোঁজখবর নেয়নি জানতে চাইলে আরএমপির বোয়ারিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রবিউল ইসলাম বলেন, মামলা দায়েরের সময় বাদীর সঙ্গে আরও সাত-আটজন ছিল। একেকজন একেক নাম বসিয়ে দিয়েছেন এজাহারে। তারা সবাই নাকি শ্রমিক দল নেতা। মামলা রেকর্ডের আগে রেকর্ডিং অফিসারের উচিত ছিল আসামিদের নামগুলো চেক করে দেখা। আমরা ইতোমধ্যে আদালতে প্রাথমিক প্রতিবেদন দিয়ে জানিয়েছি তিন নম্বর আসামি কয়েক বছর আগেই প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। এ ধরনের ঘটনার অনেকটা দায় বাদীর। মামলা দুর্বল হয় এসব কারণেই।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর শ্রমিক দল সভাপতি ও জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পাখি জানান, আওয়ামী লীগ সমর্থিত একদল শ্রমিক ও সন্ত্রাসী ২২ এপ্রিল আমার কার্যালয়ে ভাঙচুর ও দখল করেন। পরের দিন সাধারণ মোটর শ্রমিকরা কার্যালয়টি উদ্ধারে গেলে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা বোমাবাজি করে। শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। উল্টো তারাই আমাদের ওপর মামলা দিয়েছে। আমার নিহত ছেলেকেও মামলার আসামি করেছে।
টার্মিনালের সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নিতেই শ্রমিকেরা সংঘর্ষে জড়ালেও এর পেছনে বাস মালিকদের অনেকেই ইন্ধন রয়েছে। পরিবহণ থেকে ওঠা বিপুল পরিমাণ চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আগেও কয়েকবার সেখানে শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। সরকার বদল হলেই নতুন করে বিভিন্ন পক্ষ টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে উঠে। সদ্য ঘটা শ্রমিক সংঘর্ষে শ্রমিক দলভুক্ত দুইপক্ষের শ্রমিকেরা মাঠে ছিল। পুলিশ এ কারণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, মামলায় শুধু নিহত কিশোরকেই আসামি করা হয়নি; এমন অনেককেই আসামি করা হয়েছে যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না সেদিন। এটিও বিশেষ মহলের স্বার্থ হাসিলের পেছনের কৌশল বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
