বৃষ্টিপাত কমলেও হাওড়ের কৃষকের অবস্থা নাজুক
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রায় চার-পাঁচ দিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সুনামগঞ্জের হাওড়ের কৃষকের অবস্থা নাজুক। বৃষ্টির পানিতে হাওড়ে জলাবদ্ধতায় ডুবেছে ফসল। নদীতেও বেড়েছে পানি।
ইতোমধ্যে জেলার মধ্যনগর উপজেলায় দুটি বাঁধ ভেঙে হাওড়ে পানি ঢুকে ব্যাপক ফসলহানি ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত বন্ধ আছে। দুপুরের পর থেকে প্রায় সপ্তাহখানেক পর হাওড়াঞ্চলে রোদের দেখা মিলেছে। তবে তা কতক্ষণ স্থায়ী হয় তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কৃষকের স্বপ্নের ফলানো ফসল পানির নিচে। অনুকূল আবহাওয়া বিরাজমান থাকলে পানির নিচ থেকে ফসল ভেসে উঠতে আরও কমপক্ষে এক সপ্তাহ লাগবে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। এরমধ্যে পাকা-আধাপাকা ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ব্যাপক।
বর্তমানে দুই ধরনের দুর্ভোগে রয়েছেন হাওড়ের কৃষকর। হাওড়ে অধিক পরিমাণে পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন কাজ করছে না। অপরদিকে পানিতে নেমে ধান কাটতে আগ্রহী নন শ্রমিকরা। যেসব শ্রমিক ধান কাটতে চায় তাদের মজুরি দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ। এ নিয়ে হাওড়ের কৃষকরা পাকা ধান কাটা নিয়ে রয়েছেন মারাত্মক বিপাকে। বিরূপ প্রকৃতি উপেক্ষা করে বেশি টাকা দিয়ে শ্রমিক দিয়ে যারা কিছুটা ধান কেটেছিলেন তাদের ধান শুকাতে না পারায় ধানের মধ্যে চারা গজিয়েছে।
দেখার হাওড়পাড়ের কৃষক রবিউল বলেন, এবার ফসল নিয়ে আমরা রয়েছি মহাবিড়ম্বনায়। প্রথম দিকে বৃষ্টিপাতে আমাদের বেশ কাঁচা-আধাপাকা ধান তলিয়ে যায়। পরে ধান পাকা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি শুরু। এবার পাকা ধানও পানির নিচে। এ অবস্থায় কী করব বুঝতে পারছি না। সামনে অন্ধকার দেখছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক বললেন, বাঁধ ভেঙেছে দুইটি। এগুলো হচ্ছে- মধ্যনগরের এরন বিল এবং একই উপজেলার জিনারিয়া বাঁধ। এই বাঁধগুলো বড় হাওড়ের না হলেও এসব বাঁধ ভেঙে তিনটি ছোট হাওড়ে পানি ঢুকেছে।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, হাওড়ে পানিতে ১৩ হাজার ৭৯ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই হাজার ৪৭ হেক্টর। এখন পর্যন্ত হাওরে ৫১ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। বুধবার পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৮১১ হেক্টর।
তিনি জানান, আরও চার থেকে পাঁচ দিন পর পুরো ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে।
তবে কৃষি বিভাগের দেওয়া এসব তথ্যের সঙ্গে কোনোভাবেই একমত নন কৃষক ও কৃষকদের দাবি আদায়ের সংগঠনগুলো।
সুনামগঞ্জ হাওড় ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, কৃষি অধিদপ্তর মনগড়া তথ্য দিচ্ছে। সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার মধ্যে দোয়ারাবাজার ছাড়া সবকটি উপজেলার ধান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, চলমান সংকটে হাওড়ের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪০ থেকে ৪৫ পার্সেন্ট ধান এখনো পানির নিচে।
তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া যদি আগামী সপ্তাহখানে অনুকূলে থাকে তাহলে কৃষকরা হাওড়ের ধান কিছুটা তুলতে পারবেন। আর যদি আবারও বৃষ্টিপাত শুরু হয় তাহলে হাওড়ের তলিয়ে যাওয়া ধান পুরোটাই বিনষ্ট হবে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেছেন, দুই দিন বৃষ্টি কম হওয়াটা স্বস্তির। বৃহস্পতিবার রোদ ওঠায় কৃষকেরা হাওড়ে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে সুবিধা পাবেন।
তিনি বলেন, এ রকম আবহাওয়া অব্যাহত থাকবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে সুনামগঞ্জের হাওড়ে বোরো ধান কাটায় শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় জেলার সব বালুমহাল আরও পাঁচ দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এর আগে ২০ এপ্রিল থেকে ১০ দিনের জন্য সব বালুমহাল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর এসএম ইয়াসীর আরাফাত স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বালুমহাল আরও পাঁচ দিন বন্ধের বিষয়টি জানানো হয়েছে। এই সময়ে জেলার সব বালুমহালে বালু উত্তোলন, পরিবহণ বন্ধ থাকবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে- সুনামগঞ্জ জেলায় বোরো ধান কাটার মৌসুমে ব্যাপক শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। বোরো ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য এবং এটি সময়মতো ঘরে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বোরো ধান কাটায় শ্রমিকের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার বালুমহালসহ অন্য স্থান থেকে বালু, মাটি ও বালু মিশ্রিত মাটি উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু বোরো ধান কাটা শেষ না হওয়ায় আগামী ৫ মে পর্যন্ত বালুমহালে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকবে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রশাসনের এ ঘোষণা শ্রমিক সংকট মোকাবেলায় অনেকটা সহায়ক হবে বলে ধারণা করছেন কৃষকরা।
