সরকারি প্রকল্পে বাধা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চায় পানি উন্নয়ন বোর্ড
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১০:৫৮ এএম
অভিযুক্ত মো. নজরুল ইসলাম। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন নদীভাঙন প্রতিরোধ ও উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষা প্রকল্পে বারবার বাধা, চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্বেও অনুরূপ অভিযোগ ওঠার পর এবার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
অভিযুক্ত মো. নজরুল ইসলাম শ্যামনগর উপজেলার ৯ নম্বর বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্ম পরিষদ ও সুরা সদস্য বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৩ মে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর পাঠানো একাধিক পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ প্রকল্প (কম্পোনেন্ট-১, বাপাউবো অংশ)’ এর প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া দাবি করেন, শ্যামনগরের খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা এবং বাঁধ সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন নদীতীর রক্ষায় চলমান প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পোল্ডার-৫ এলাকায় খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা, স্লোপ প্রোটেকশন, জিওব্যাগ ডাম্পিং ও সিসি ব্লক স্থাপনের কাজ চলছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডিএল-উন্নয়ন (জেভি), ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের পক্ষে আর-রাদ করপোরেশন। প্রকল্প এলাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে শ্যামনগরের পূর্ব দুর্গাবাটি, পশ্চিম দুর্গাবাটি, দাতিনাখালী ও ঝাপালি এলাকা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, শুরু থেকেই স্থানীয় চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বিভিন্নভাবে প্রকল্পের কাজে বাধা দিয়ে আসছেন। প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দায়িত্বরত প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, শ্রমিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পাউবোর অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সরাসরি প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে প্রকল্প অফিস ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যন্ত্রপাতি নষ্ট এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
এরপর সেনাবাহিনী ক্যাম্প, জেলা প্রশাসন ও শ্যামনগর থানায় একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষা মৌসুমের আগে বাঁধ সুরক্ষার কাজ শেষ না হলে জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণে ঝুঁকি নিয়েই সীমিত পরিসরে জিওব্যাগ ডাম্পিং ও সিসি ব্লক তৈরির কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ১৪ এপ্রিল পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকায় প্রকল্প সাইটে গিয়ে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, স্থানীয় কয়েকজন জামায়াত নেতাকর্মী ও বহিরাগত লোকজন মানববন্ধনের নামে বিক্ষোভ করেন। এ সময় প্রকল্প এলাকায় কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মারধরের হুমকি দেওয়া হয়।
এছাড়া স্কেভেটরের চালক ও সহকারীকে যন্ত্রের ভেতরে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টারও অভিযোগ করা হয়েছে। পরে উপস্থিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পুলিশের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই ঘটনার পর শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তাহীনতায় অধিকাংশ শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দেন। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান অভিযোগ করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্প পরিদর্শনে গেলে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তার কাছে ১২ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয়। টাকা না দিলে কাজ বন্ধ, মানববন্ধন এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিকদের কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সাব-ঠিকাদারদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্প এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এ নিয়ে এটিই প্রথম অভিযোগ নয়। গত ১৪ এপ্রিল শ্যামনগর থানায় দায়ের করা আরেকটি লিখিত অভিযোগে আর-রাদ করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন একই ধরনের অভিযোগ করেন।
সেই অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পের সিসি ব্লক তৈরির স্থান ও যন্ত্রপাতি রাখা সরকারি জমিতে কাজ চলাকালে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম লোকজন নিয়ে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। পরদিন আবার ৩০ থেকে ৪০ জন লোক নিয়ে নির্মাণাধীন বাঁধ ভেঙে ফেলা হয়। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারি সামাজিক বনায়নের জায়গায় অবৈধভাবে ব্লক নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই আমি বাধা দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি আরও দাবি করেন, জমি সংক্রান্ত পূর্বের বিরোধের জের ধরেই তাকে হয়রানির চেষ্টা চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, বর্ষা মৌসুমের আগেই কাজ শেষ করা না গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে জনবসতি, কৃষিজমি ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রকল্প এলাকায় প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম রাজু আহমেদ বলেন, নতুন পুলিশ সুপার যোগদান করেছেন। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা এখনো পুরোপুরি অবগত নই। তবে সরকারি উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে জেলা পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা জেনেছি। তবে এখনো অফিসিয়ালি অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
