একসঙ্গে স্ত্রী ও তিন সন্তান হারিয়ে নির্বাক শহিদুল
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের খোশালনগর-বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের মাঠপাড়া শহিদুল ইসলামের বাড়িতে শত শত মানুষ ভিড়। মঙ্গলবার এই বাড়িতে ঈদের পরে নতুন করে ঈদ আনন্দ হওয়ার কথা ছিল।
অথচ, পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে গেছেন শহিদুল। কখনো হাউমাউ করে কান্না করছেন আবার কখনো নিশ্চুপ হয়ে মানুষের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন।
মঙ্গলবার ভোরে ঢাকা-ভাঙ্গা হাইওয়ে এক্সপ্রেসের মালিগ্রাম এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কায় শহিদুলের স্ত্রী, তিন সন্তান ও প্রাইভেটকার চালকের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের চাচা মিঠু হোসেন ও জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তাদের ভাইপো আরিফ প্রায় ১১ বছর ১৭ দিন পর মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরেছে। সে কারণে তাকে বিমানবন্দরে রিসিভ করতে ভাবি, ভাইপো, ভাইঝি ও তার দুই সন্তান সোমবার রাতে একটি প্রাইভেটকারযোগে ঢাকায় যান। তাকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে রাতেই প্রাইভেটকারে করে তারা বাড়ির দিকে ফিরছিলেন।
জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ভোর সাড়ে ৩টার দিকে ড্রাইভারের ফোন নাম্বার থেকে একজন সবজি ব্যবসায়ী পরিচয়ে প্রথমে আমাকে জানান দুর্ঘটনার কথা।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার বাড়িতে ফিরে বুধবার (৩ জুন) বিয়ের জন্যে মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল ভাইপো আরিফ ইসলামের (২৪)। তাকে বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করতে গিয়েছিলেন মা নূরজাহান (৫০), ছোটভাই রাকিব (১৭) বোন আয়েশা বেগম (২৮), ভাগ্নে হুসাইন (৭) ও ভাগ্নি তাসফিয়া (৩)। আর প্রাইভেটকারের ড্রাইভার ছিলেন জাহিদ (৩০)। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-ভাঙ্গা হাইওয়ে এক্সপ্রেসের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম এলাকায় দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজন ও ড্রাইভারের মৃত্যু হয়। এ দুর্ঘটনায় শিশু হুসাইন ও তাসফিয়া আহত হয়েছে।
জাহাঙ্গীর জানান, ড্রাইভার জাহিদ আমাদের পাশের গ্রাম রাজগঞ্জের বাসিন্দা। তার সাত বছরের একটি মেয়ে আছে, স্ত্রী সন্তানসম্ভবা।
তিনি বলেন, আজ যে বাড়িতে ঈদ আনন্দ হওয়ার কথা, সেখানে এখানে বিষাদের রাজ্য। সবার চোখেমুখে কান্নার ছাপ।
নিহত নূরজাহানের ভাই পাশের উপজেলা মণিরামপুরের বাসিন্দা হজরত আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সকালে খবর পেয়ে চলে এসেছি। আমার বোন, ভাগ্নে, ভাগ্নিসহ পাঁচজনের এই অকাল মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো না।
তিনি বলেন, ভাগ্নে দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরছে। সেকারণে তার মা, ভাই, বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নি সবাই গিয়েছিল বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করতে। হায়রে কপাল, এখন তাদের লাশ আনতে এখান থেকে লোকজনকে যেতে হচ্ছে।
বাঁকড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর মোসলেম উদ্দিন বলেন, শহিদুল ইসলাম খুবই দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। প্রায় ১১ বছর আগে সংসার যেন একটু সচ্ছল হয়, সে কারণে ছোট থাকতেই ছেলেকে মালয়েশিয়া পাঠান ইজিবাইক চালক শহিদুল। ছেলে পাঠানো টাকায় এই বালিয়াডাঙ্গার মাঠপাড়া ৫ শতকের মতো জায়গা কিনে সেখানে ইটের গাঁথুনিতে টালি ছাওয়া একটি বাড়ি, একটি গোয়ালঘর করেছেন। ইচ্ছে ছিল, ছেলে বিদেশ থেকে ফিরে বিয়ে করে কিছুদিন পর আবারও চলে যাবে। কিন্তু তার সে আশা নিরাশায় রূপ নিয়েছে। এখন তাদের দাফনের জন্যে আমার পারিবারিক কবরস্থানে জায়গা নির্ধারণ করেছি। কাফনের কাপড় কেনা হয়েছে। লাশ এলে সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে।
মঙ্গলবার (২ জুন) ভোরে ঢাকা-ভাঙ্গা হাইওয়ে এক্সপ্রেসের মালিগ্রাম এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে দ্রুতগামী প্রাইভেটকার ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই দুই নারী ও দুই পুরুষসহ মোট চারজন নিহত হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও একজন মারা যায়। এ সময় দুই শিশু গুরুতর আহত হয়।
