গণঅভ্যুত্থানে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, ক্ষুব্ধ জুলাই যোদ্ধারা
নুরুজ্জামান সুমন, ফেনী
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
গণঅভ্যুত্থানে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফেনীতে জুলাই ছাত্র-জনতা আন্দোলনে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র দুই বছর পরও উদ্ধার হয়নি। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে হাতে অস্ত্র নিয়ে নিরীহ ছাত্রজনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া চিহ্নিত সন্ত্রাসীদেরও নেই কোনো গ্রেফতার। এসব মরণঘাতী অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় মনে ক্ষোভ ও আতঙ্ক জুলাই যোদ্ধাদের। তারা দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
পুলিশ সূত্রে জানা যায় , জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফেনীর মহিপালে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৭টি হত্যা মামলা ও ১৫টি হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ১৯৯ জনকে। ইতোমধ্যে তিনটি হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র–জনতার ওপর অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে হামলায় ৭ জন নিহত এবং চার শতাধিক আহত হন।
আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ ফেনী সদর উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের আবু জাফর ইকবালের সঙ্গে বুধবার কথা হয় যুগান্তরের। তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে আমরা বারবার প্রশাসনকে তাগাদা দেওয়ার পরও কোনো ফল পাচ্ছি না। আহত জুলাই যোদ্ধারা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বারবার বৈঠক করে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন; কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।
তিনি বলেন, মূলত অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। নির্বাচনের পর আগ্রহ নেই অন্যান্য বাহিনীরও। আমরা সম্প্রতি প্রশাসনকে সরকার দলের একজনের কাছে অবৈধ অস্ত্রের রয়েছে - এমন তথ্য দিয়েছিলাম। সে অস্ত্রও প্রশাসন উদ্ধার করতে পারেনি। উলটো এখন আমাদেরকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। বিভিন্ন ফেক আইডি থেকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমার ছবি পোস্ট করে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে গুপ্তহত্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবনও হুমকির মুখে।
তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ছাত্রদের সব যৌক্তিক আন্দোলনে সম্মুখসারিতে ছিলাম আমি। ২৪ সালের ৪ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারবিরোধী আন্দোলনে আমি মহিপাল ছিলাম। দুপুরে ছাত্রজনতা এক হয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ করেছিলাম। তখন আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ট্রাংক রোড থেকে গুলি করতে করতে মহিপালের দিকে আসে। আমরা এগিয়ে গেলে সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। জেলা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি জিয়া উদ্দিন বাবলু সরাসরি আমাকে গুলি করে।
আবু জাফর আরও জানান, নিজাম হাজারীর নির্দেশে নিরীহ ছাত্রজনতার ওপর গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। সেদিনের গুলিবর্ষণের ঘটনায় ফেনীতে ১১ জন ছাত্রজনতা নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন বহু ছাত্রজনতা। তিনি নিজে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি বলে জানান।
বর্তমান সরকারের শুরুতেই ফেনীতে অস্ত্র উদ্ধারের কোনো পদক্ষেপ না থাকায় হতাশ গুলিবিদ্ধ অপর জুলাই যোদ্ধা কাজী মোহাম্মদ মোছলেহ উদ্দিন শান্ত।
ফেনী পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড সুলতানপুরের বাসিন্দা শান্ত যুগান্তরকে বলেন, আমরা আসা করেছিলাম সদর আসনের এমপি অবৈধ অস্ত্র নিয়ে কথা বলবেন, পদক্ষেপ নিবেন। কিন্তু কিছুই দেখলাম না। যাদের রক্তের বিনিময়ে তারা ক্ষমতায় তাদের ভুলে গেছেন।
অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অস্ত্রগুলো ফেনীতেই আছে বলে আমরা ধারণা করছি। কারণ যাদের হাতে অস্ত্র ছিল তারা এখন দেশের বাইরে। তারা তো যাওয়ার সময় অস্ত্রগুলো নিয়ে যায়নি। নিশ্চয়ই কারও কাছে দিয়ে গেছেন। এখন এতগুলো অস্ত্র গেল কোথায়। হয়তো শুধু হাতবদল হয়েছে। অন্য একটি দলের লোকের কাছে থাকতে পারে। যারা এখন ওই সব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বাড়িঘর ব্যবসা বাণিজ্য দেখাশোনা করছেন। সেজন্য অস্ত্র উদ্ধার অভিযান হচ্ছে না বলে আমরা মনে করছি।
তিনি বলেন, সরকার পতনের পর অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবিতে ফেনীতে ছাত্রজনতার আন্দোলন তুঙ্গে ছিল। দাবির মুখে তৎকালীন ডিসি ফেনী থেকে বদলি হন; কিন্তু ভয়াবহ বন্যার কারণে সে আন্দোলন বেশি এগোয়নি।
তিনি জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং মহিপালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মামলার জড়িত আসামিদের গ্রেফতার ও দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানান।
অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় ‘আতঙ্ক’ মনে করছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে তারা (আওয়ামী লীগ) আবারও যেকোনো সময় এগুলো ব্যবহার করতে পারে। আমরা দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আওয়ামী লীগের নেতারা পালিয়ে গেছেন। যদি অস্ত্র সঙ্গে না নিয়ে থাকেন, তবে সেগুলো এখন কার দখলে?
এ বিষয়ে ফেনী মডেল থানার ওসি ফৌজুল আজিম জানান, ইতোমধ্যে অস্ত্রধারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে অস্ত্রগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে। হয়তো অস্ত্রগুলো ফেনী থেকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলছে। পুলিশ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সবসময় তৎপর রয়েছে বলে দাবি তার।
পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, যারা এসব অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে, তারা সবাই পালিয়েছে। তবে তাদের বিষয় আমাদের অনুসন্ধান, তদন্ত এবং অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।
