কেঁচো দিয়ে কুঁচিয়া ধরেই চলে আট সদস্যের সংসার
মো. রফিক উল্যাহ, রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
কেঁচো দিয়ে কুঁচিয়া ধরেই চলে নিতাইয়ের আট সদস্যের সংসার
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভোরের আলো ফোটার আগেই লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে নেমে পড়েন নিতাই সরকার। হাঁটুসমান পানিতে কাঁধে বাঁশের তৈরি ফাঁদ আর হাতে একমুঠো কেঁচো নিয়ে শুরু হয় তার প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ। এই কেঁচোই তার মূলধন।
কেঁচোর টোপে ধরা পড়া কুঁচিয়া—স্থানীয়দের ভাষায় 'মেটোসাপ' (মাডিয়া সাপ) বিক্রি করেই চলে তার আট সদস্যের সংসার।
সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা নিতাই সরকার প্রায় নয় বছর আগে জীবিকার সন্ধানে রামগঞ্জ উপজেলার বালুয়া চৌমুহনী এলাকায় আসেন। নিজ এলাকায় একই পেশায় থাকলেও পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় নতুন আশায় পাড়ি জমান এখানে। বর্তমানে বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি।
শুধু নিতাই নন, তার মতো আরও ২০ থেকে ২৫ জন সিলেট অঞ্চলের মানুষ রামগঞ্জের বিভিন্ন খাল, বিল ও জলাভূমিতে কুঁচিয়া সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কৃষিকাজে লোকসান, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দারিদ্র্য তাদের এ পেশায় নিয়ে এসেছে।
কুঁচিয়া ধরা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। প্রথমে কেঁচো সংগ্রহ করতে হয়। এরপর বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদে কেঁচো গেঁথে জলাভূমিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। পরদিন ভোরে সেই ফাঁদ তোলা হয়। তবে প্রতিটি ফাঁদে কুঁচিয়া ধরা পড়ে না। অনেক সময় শিং, কৈ কিংবা টাকি মাছও উঠে আসে।
ধরা পড়া কুঁচিয়া জীবিত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ হলে সেগুলো ঢাকার আড়তে পাঠানো হয়। সেখানে প্রতি কেজি কুঁচিয়া ২শ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও কুঁচিয়ার ভালো চাহিদা রয়েছে।
বর্ষা মৌসুমই কুঁচিয়া শিকারিদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। এ সময় জলাভূমিতে কুঁচিয়ার প্রাচুর্য থাকায় মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে বছরের বাকি সময় কুঁচিয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।
নিতাই সরকার বলেন, বর্ষায় কিছুটা ভালো আয় হয়; কিন্তু বছরের অন্য সময় খুব কষ্টে চলতে হয়। আগের মতো এখন আর কুঁচিয়াও পাওয়া যায় না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাব্বির আহমেদ সিফাত বলেন, কুঁচিয়া পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রাণী। এটি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ জরুরি।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, রামগঞ্জে কুঁচিয়ার স্থানীয় বাজার না থাকলেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবং বিদেশে এর চাহিদা রয়েছে। কেউ কুঁচিয়া চাষে আগ্রহী হলে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।
