Logo
Logo
×
   

সারাদেশ

ভিডিও কাণ্ড

বদলে যাচ্ছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের রাজনীতি, ভোটের সমীকরণে নতুন হিসাব

Icon

মো. মুজাহিদুল ইসলাম, সাতক্ষীরা

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১১:০০ পিএম

বদলে যাচ্ছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের রাজনীতি, ভোটের সমীকরণে নতুন হিসাব

বদলে যাচ্ছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের রাজনীতি, ভোটের সমীকরণে নতুন হিসাব

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও কাণ্ডের পর জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী থেকে তার বহিষ্কারের পর সম্ভাব্য উপনির্বাচন, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং ভোটের মাঠে এর প্রভাব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

ভিডিও প্রকাশের পর প্রথমে এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করেছিলেন গাজী নজরুল ইসলামের সমর্থকরা। পরে তিনি ভিডিওতে থাকা নারীকে নিজের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ হিসেবে দাবি করেন। একই সঙ্গে পুরো ঘটনাকে পরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির ষড়যন্ত্র বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থামেনি। ভিডিও, বিয়ে সংক্রান্ত তথ্য, বিভিন্ন নথি ও বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয়ভাবে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছিলেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোট ব্যবধান ছিল ২১ হাজার ৪৮৭।

সংসদ সদস্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, এ আসনে উপনির্বাচন হবে কিনা। তবে আইনগতভাবে শুধু দল থেকে বহিষ্কার হলেই সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয় না বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম বিপ্লব হোসেন বলেন, দলীয় বহিষ্কার একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত; কিন্তু সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার বিষয়টি সংবিধান ও আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নথিভুক্ত করতে পারে। তবে শুধু বহিষ্কারের চিঠির ভিত্তিতে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য ঘোষণা করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। এ বিষয়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।

এদিকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্থানীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শ্যামনগর ও কালীগঞ্জের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে জাতীয় রাজনীতির এ ঘটনাকে ঘিরে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদ সদস্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটের মাঠেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় ভাবমূর্তি, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারদের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

শ্যামনগর পৌর শহরের ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত আচরণ ও ভাবমূর্তি এখন সাধারণ মানুষ গুরুত্ব দিয়ে দেখে। এমন ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে আলোচনা তৈরি করে।

কালীগঞ্জের মুদি ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, মানুষ এখন দল দেখার পাশাপাশি প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা ও সততাকেও গুরুত্ব দেয়। শেষ পর্যন্ত ভোটাররাই সিদ্ধান্ত নেবেন।

তবে জামায়াত সমর্থকদের অনেকেই মনে করছেন, একজন ব্যক্তির ঘটনায় পুরো সংগঠনকে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। তাদের দাবি, দল বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে।

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় আসন শূন্য হয় এবং দল আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি নির্বাচনে অংশ নেব। তবে সিদ্ধান্ত জনগণের।

তিনি আরও বলেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জনগণ তাদের মতামত প্রকাশ করবেন।

সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, এ ঘটনায় জামায়াত রাজনৈতিকভাবে সংকটে পড়েছে। আগামী নির্বাচনগুলোতে এর প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, নৈতিকতা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। নির্বাচন হলে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা মাঠে কাজ করব।

এদিকে ভিডিও কাণ্ডকে কেন্দ্র করে শ্যামনগরে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশ থেকে সংসদ সদস্যের পদত্যাগ এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়।

সব মিলিয়ে গাজী নজরুল ইসলাম ইস্যুতে সাতক্ষীরা-৪ আসনের রাজনীতি এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সম্ভাব্য উপনির্বাচন এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন- দুই ক্ষেত্রেই এই বিতর্ক ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক মহলের নজরে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইনি প্রক্রিয়া, দলীয় সিদ্ধান্ত এবং ভোটারদের মনোভাব—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে সাতক্ষীরা-৪ আসনের আগামী রাজনৈতিক গতিপথ।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .