গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর
কিশোর রাকিব হত্যা: ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় পরিবার
তাবারক হোসেন আজাদ, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:০৫ এএম
মো. রাকিব হাসান। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ইছাপুর গ্রামে লতাপাতা জড়ানো একটি কবরে শুয়ে আছে ১৩ বছর বয়সি কিশোর মো. রাকিব হাসান। ১৯ জুলাই তার মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে দুই বছর পরও শোকের পাথর যেন হয়ে আছে রাকিবের বাবা আবুল খায়েরের বুক। মোবাইলফোনে ছেলের কথা উঠতেই দীর্ঘনিঃশ্বাস, এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা। একপর্যায়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন, বুকটা ভেঙে যাচ্ছে। আমার বাবু কোথায়? কী দোষ ছিল তার? কেন তাকে হত্যা করা হলো?
২০২৪ সালের জুলাই মাসের উত্তাল দিনগুলোর কথা আজও ভুলতে পারেন না ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের লাইনম্যান আবুল খায়ের। সে সময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জুলাইজুড়ে উত্তাল ছিল মোহাম্মদপুর। সেখানকার আইটিজেড স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল রাকিব। বাবা আবুল খায়ের ও স্নাতকপড়ুয়া বড় ভাই আবু রায়হানের সঙ্গে সে মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডের একটি ভাড়া বাসায় থাকত।
আবুল খায়েরের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রাকিব ছিল সবার ছোট, তাই ছিল পরিবারের সবার আদরের। ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য বাবা তাকে গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। মা পারভীন আক্তার ছেলেকে দূরে পাঠাতে কষ্ট পেলেও ভালো ভবিষ্যতের আশায় রাজি হয়েছিলেন। বাবাই ছেলের জন্য রান্না করতেন, যেন মায়ের অভাব না হয়। কিন্তু সেই ছেলেকে শেষ পর্যন্ত আগলে রাখতে পারেননি তিনি।
জুলাইয়ের সেই উত্তাল সময়ে আবুল খায়েরের কাছে একটি ফুটবলের জন্য বায়না ধরেছিল রাকিব। বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন, আন্দোলনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বল কিনে দেবেন। কিন্তু ছেলের আবদারের কাছে হার মেনে শেষ পর্যন্ত ফুটবলটি কিনে দেন। তবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, মিছিল-মিটিং থাকলে বাইরে খেলতে যাওয়া যাবে না।
১৯ জুলাই ছিল বাবার সঙ্গে রাকিবের শেষ দেখা। সেদিন পরিস্থিতি খারাপ থাকায় খেলতে যেতে নিষেধ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বিকালের কোনো একসময় বাবার অজান্তেই রাকিব বাইরে বেরিয়ে যায়। ছেলেকে ফুটবল কিনে দেওয়ার কথা মনে করে আজও আফসোস করেন আবুল খায়ের।
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও রাকিব বাসায় না ফেরায় উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে খুঁজতে বের হন বাবা। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে থাকেন। প্রথমে যান মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতালে। সেখান থেকে পাঠানো হয় জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। সেখানে পৌঁছে তিনি আর ছেলেকে জীবিত পাননি। হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল রাকিবের নিথর দেহ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সূত্রে আবুল খায়ের জানতে পারেন, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন একটি সড়কে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিল রাকিব। ওই এলাকায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার উপস্থিতি ছিল। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্না থামাতে পারেন না আবুল খায়ের। তিনি বলেন, আমার ছেলেটা খুব আদরের ছিল। কোনো দিন গায়ে হাত তুলিনি। সে ব্যথা পেলে আমার শরীরেও যন্ত্রণা হতো। সেই ছেলের মাথায় গুলি লাগল। কতই না কষ্ট পেয়েছে সে। নিজের হাতে ওকে কবরে নামিয়েছি। আমি কেন বেঁচে আছি, জানি না।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাকিব হাসানসহ লক্ষ্মীপুর জেলার ১৬ জন শহীদ হন। তাদের মধ্যে রাকিবই সবচেয়ে কম বয়সি। তবে সরকারি গেজেটে তার নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে ‘রাকিব হোসেন’ হিসেবে।
রাকিব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবুল খায়েরের চাচাতো ভাই নুরুল আমিন বাদী হয়ে মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চলতি মাসে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে এত দিনেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কারও শাস্তি না হওয়ায় হতাশ রাকিবের বাবা। তিনি বলেন, আমার তো কোনো শত্রু ছিল না। ছেলেটারই-বা কত বয়স ছিল! আমার তো সব শেষ।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে লক্ষ্মীপুর জেলায় ১৬ জন প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে ছয়জন শিক্ষার্থী, চারজন শ্রমিক, একজন অটোরিকশাচালক এবং পাঁচজন ব্যবসায়ী। শহীদদের বেশির ভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে রায়পুর উপজেলার দুজন, রামগঞ্জের ছয়জন, লক্ষ্মীপুর সদরের পাঁচজন, রামগতির দুজন এবং কমলনগর উপজেলার একজন বাসিন্দা ছিলেন।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সম্রাট খীসা সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, শহীদদের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।

