মিঠামইন বিএনপির সভাপতি হত্যা
‘মাস্টারমাইন্ড’ ছাত্রদল নেতা খোকার ভাইরাল ভিডিও বার্তায় তোলপাড়
কিশোরগঞ্জ ব্যুরো
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
মোকাররম হোসেন খোকা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কিশোরগঞ্জের চাঞ্চল্যকর মিঠামইন বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম ওরফে জাহাঙ্গীর (৫২) হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকার একটি ভিডিও বার্তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অজ্ঞাত স্থান থেকে স্মরণকালের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পলাতক প্রধান পরিকল্পনাকারী চিহ্নিত ওই ছাত্রদল নেতার এমন ভিডিও বার্তায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, যখন হত্যাকাণ্ডে জড়িত ঘাতকদের কিলিং মিশনে পাঠানো ওই পলাতক ছাত্রদল নেতাকে গ্রেফতার করতে গলদঘর্ম হচ্ছে- তখন কোথা থেকে কী করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এমন ভিডিও বার্তা প্রচার করলেন ছাত্রদল নেতা মোকাররম হোসেন খোকা?
এ বিষয়ে পুলিশ কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাকে আটকের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, গত বুধবার (৫ আগস্ট) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া ওই ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে প্রশাসন ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মোকাররম দাবি করেন, হামলার ঘটনায় আটক এক ব্যক্তি তার নাম উল্লেখ করেছেন বলে তিনি জেনেছেন। তবে ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার কখনও দেখা হয়নি বা ফোনেও কথা হয়নি।
তিনি বলেন, জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং আমি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক। আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনি এলাকা ভিন্ন হওয়ায় জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তার কোনো রাজনৈতিক বিরোধ ছিল না।
মোকাররম বলেন, আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো তথ্য-প্রমাণ থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু কোনো ব্যক্তির কথার ভিত্তিতে যেন আমার ওপর জুলুম করা না হয়।
এ ভিডিও বার্তায় আত্মগোপনে থাকার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডে তার নাম জড়ানোর কথা শোনার পর অযথা হয়রানির আশঙ্কায় তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
এতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে মোকাররম বলেন, হত্যাকাণ্ডে অর্থনৈতিকভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ সত্য নয়। প্রশাসন চাইলে তার আর্থিক লেনদেন তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য বের করতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রায় ২০ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে নানা সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। এ বিষয়ে তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীর কাছে দোয়া চান।
হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত পলাতক মোকাররম হোসেন খোকার এমন ভিডিও বার্তায় হতবাক ও বিস্মিত মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল্লাহ মিয়া। তিনি বৃহস্পতিবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, যখন জাহাঙ্গীর আলম হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত মোকাররম হোসেন খোকাকে গ্রেফতারে পুলিশ গলদঘর্ম- তখন কী করে কোত্থেকে সেই ব্যক্তি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এমন ভিডিও বার্তা প্রচার করতে পারেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবিলম্বে খোকাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ নিয়ে মিঠামইন থানার ওসির বক্তব্য নিতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারব না। এসপি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
তারপর কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের বক্তব্য নিতে তাকে একাধিকবার রিং দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় নাম আসায় মোকাররম হোসেনকে ইতোমধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে জেলা ছাত্রদল। জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহাত ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠনের সব পর্যায়ের পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাফিউল ইসলাম বলেন, জাহিদুল আলম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনতার হাতে আটক হেলালের জবানবন্দিতে মোকাররমের নাম এসেছে। এছাড়া পুলিশের হাতে আটক তিন আসামি তার স্বজনদের বাড়িতে তিন দিন অবস্থান করেছিলেন বলে অভিযোগ প্রমাণ মিলেছে। এসব অভিযোগের পরও তিনি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ না করে আত্মগোপনে থাকায় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৫ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে মিঠামইন সদর এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের ওপর ধারাল অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হামলার পর এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পুলিশ ঘটনাস্থল এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে সশরীরে অংশ নেওয়া বরগুনার বামনা উপজেলার চাকাতাসুনিয়া গ্রামের মো. হেলাল (২৪), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার সুধামপুর গ্রামের মহিন উদ্দিন (৩২) এবং মধ্যপাড়া গ্রামের মো. শাহিন আলমকে (২৭) গ্রেফতার করে।
এ সময় পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে হেলাল জানান, খোকা নামে এক ব্যক্তি তাদের এ কিলিং মিশনে পাঠায়। এছাড়া খোকার সঙ্গে থাকা অন্য এক ব্যক্তি কাশিমপুর কারাগার থেকে তাকে জামিনে মুক্তি করিয়ে আনেন। এই তিন ভাড়াটে ঘাতক বর্তমানে কিশোরগঞ্জ কারাগারে অন্তরীণ রয়েছে।
এ ঘটনায় নিহত জাহিদুল আলমের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয়ে আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে মিঠামইন থানায় হত্যা মামলা করেন।
