একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির রোজ কী পরিমাণ খাবার ও পানি লাগে?
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘হাতি বাঁচলে বাঁচবে বন, হাতি করবে বন সংরক্ষণ’—এই স্লোগানে বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে শেরপুরে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া রেঞ্জ, শ্রীবরদীর বালিজুড়ি রেঞ্জ ও নালিতাবাড়ীর মধুটিলা রেঞ্জে শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটি, ‘হাতির খবরাখবর ও সচেতনতা’ গ্রুপ, বন বিভাগসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা, মানববন্ধন ও পদযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সভাপতি সুজয় মালাকার জানান, গারো পাহাড়ে বিচরণকারী বন্যহাতিরা বর্তমানে নানা সংকটের মুখে রয়েছে। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাবার এবং ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু বন ধ্বংস, বনের ভেতরের ঝিরিগুলো শুকিয়ে যাওয়া এবং হাতির চলাচলের প্রাচীন পথগুলো বেদখল হওয়ায় তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত হাতির দল দিগভ্রান্ত হয়ে সমতলে নেমে আসছে।
তিনি বলেন, বালিজুড়ি রেঞ্জের ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমিতে বর্তমানে প্রায় ১২০টি হাতি রয়েছে। অথচ বনের বর্তমান পরিবেশ এসব হাতির জন্য মোটেও অনুকূল নয়। গত ১০-১৫ বছর ধরে হাতির লোকালয়ে আসার প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এতে বাড়ছে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব। মারা যাচ্ছে হাতি, হতাহত হচ্ছেন মানুষও।
বনে হাতির খাবারের সংস্থান ও পানির আধার বাড়ানোর পাশাপাশি বনে অবাধ প্রবেশ বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে বনবিনাশী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
সুজয় মালাকার আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কিছুসংখ্যক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কারণে বন্যহাতি উত্যক্তের ঘটনা বাড়ছে। এটি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
শেরপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি ও শেরপুর সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল কাদির বলেন, ‘হাতি বাঁচলে বাঁচবে গারো পাহাড়। এটি আমাদের ফ্ল্যাগশিপ প্রাণী। তাই হাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি জনপদে গত ১৬ বছরে (২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে) হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে ৪৭ জন মানুষের প্রাণ গেছে। এ ছাড়া হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। একই সময়ে মারা গেছে ৩৫টি হাতি। নিহত হাতিগুলোর বেশির ভাগই বিদ্যুতের পাতা ফাঁদে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অথবা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে।
শেরপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নুরুল করিম জানান, হাতি-মানুষের সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে বনের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে। বনভূমিতে হাতির উপযোগী খাদ্যসমৃদ্ধ বাগান তৈরির কাজও চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, বন্যহাতি সুরক্ষায় সচেতনতা তৈরিতে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন, সোলার ফেন্সিং ও বায়োফেন্সিং করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় পানির সংকট সমাধানের লক্ষ্যে হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় দেশের বনাঞ্চলে কৃত্রিম জলাধার বা হ্রদ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেদখল হওয়া বনভূমি উদ্ধারের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
এসব কর্মসূচিতে গারো পাহাড় অঞ্চলে বন্যহাতি সুরক্ষা ও সংরক্ষণ, মানুষ-হাতির সহাবস্থান এবং সংঘাত নিরসনে জনসচেতনতা বৃদ্ধির নানা বার্তা তুলে ধরা হয়।
শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির উদ্যোগে ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া এলাকায় সীমান্ত সড়কে পদযাত্রা ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি সুজয় মালাকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পথসভাটি সঞ্চালনা করেন আপন শিক্ষা পরিবারের প্রধান শিক্ষক ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষক রহমত আলী।
এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ঝিনাইগাতী বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মো. হেলালউদ্দিন, কাংশা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সামিউল হক, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির অর্থ সম্পাদক দেবদাস চন্দ বাবু, সদস্য কাঞ্চন মারাক, নিধারঞ্জন কোচ, লিয়াকত হাসান, পরিবেশকর্মী আশরাফুল ইসলাম, রফিক সরকার, মো. আরফান, শুভংকর বিশ্বাস ও পিপলু।
