Logo
Logo
×
   

সারাদেশ

‘বই পড়ি, মন গড়ি’—২৫ হাজার শিক্ষার্থী-বইয়ের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক

Icon

সৈয়দ সালাউদ্দিন, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১০ পিএম

‘বই পড়ি, মন গড়ি’—২৫ হাজার শিক্ষার্থী-বইয়ের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক

ছবি: যুগান্তর

একটি উপজেলা, ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী—সবাইকে একই পাঠাভ্যাসের ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নিয়েছে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন। উদ্দেশ্য শুধু বই পড়ানো নয়; শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠক হিসেবে গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যেই ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ স্লোগানে শুরু হয়েছে শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব-২০২৬।

গেল জুলাই মাসে শুরু হওয়া এ আয়োজন এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। শ্রেণিকক্ষের নির্ধারিত পাঠের বাইরে শিক্ষার্থীদের পড়তে দেওয়া হচ্ছে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, জীবনী ও বিভিন্ন জ্ঞানভিত্তিক বই। পড়ার পর সেই বই নিয়েই হচ্ছে মূল্যায়ন। এক ধাপ পেরিয়ে যেতে হলে পড়তে হবে নতুন বই, দিতে হবে নতুন পরীক্ষা।

আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো কার্যক্রম সাজানো হয়েছে তিনটি পর্যায়ে—‘মুকুল’, ‘ফুল’ ও ‘ফল’। প্রতিটি ধাপেই রয়েছে পাঠ এবং মূল্যায়ন। ফলে উৎসবটি এককালীন কোনো প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিকভাবে বই পড়ার সুযোগ তৈরি করছে।

শুরুতেই শিক্ষার্থীদের কাছে বইয়ের বার্তা:

প্রথম ধাপ ‘মুকুল’ পর্বের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার শ্রীমঙ্গলের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় উদ্বুদ্ধকরণ সমাবেশ। সেখানে শিক্ষার্থীদের বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

এসব কর্মসূচির মূল উদ্দোক্তা শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান। তিনি উপজেলার ভৈরবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, সিরাজনগর জে.এস.এস.আর. মাদ্রাসা, শ্রীমঙ্গল আনোয়ারুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসা, সেন্ট মার্থাস হাই স্কুল এবং ভূনবীর দশরথ স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ আরও বিভিন্ন হাইস্কুল পরিদর্শন করেন।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সময় তিনি নিজের বই পড়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। তার মতে, বই কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়; মানুষের চিন্তার জগৎকে বিস্তৃত করার অন্যতম মাধ্যম।

মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। বই মানুষকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করতে শেখায় না, নিজেকে জানতে, সমাজকে বুঝতে এবং বিশ্বকে চিনতে শেখায়। আমাদের বিশ্বাস, বইপড়া একটি প্রজন্মই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।’

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসবের সমন্বয়ক ও শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসবের নির্বাহী পরিচালক দেবাশীষ দাশ এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্লাবন পাল।

প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে পাঠাভ্যাস:

উৎসবের প্রথম পর্যায়ে শ্রেণিভিত্তিক ১৪টি নির্ধারিত বই পড়ছে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী। আগামী ১৭ আগস্ট এসব বইয়ের ওপর নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হবে পরীক্ষা।

এ পরীক্ষার ফল থেকেই নির্ধারিত হবে পরবর্তী ধাপের অংশগ্রহণকারী। প্রতিটি শ্রেণি থেকে সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থী ‘ফুল’ পর্বে যাওয়ার সুযোগ পাবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের জন্য নির্ধারিত হবে নতুন বই। সেই বই পড়ে আবারও দিতে হবে পরীক্ষা।

এরপর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শ্রেণি থেকে সেরা তিনজন শিক্ষার্থী নির্বাচিত হবে উপজেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত ‘ফল’ পর্বের জন্য। সেখানেও থাকছে নতুন বই এবং নতুন মূল্যায়ন। সবশেষে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিটি শ্রেণির সেরা ১০ জন শিক্ষার্থী নির্বাচিত হবে।

এই প্রক্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে কমপক্ষে তিনটি আলাদা বই পড়তে হবে। অর্থাৎ শুধু প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই নয়, পুরো আয়োজনের প্রতিটি ধাপ শিক্ষার্থীদের বই পড়ার ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করছে।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, অংশ নিতে পারবেন সবাই:

শ্রীমঙ্গলের এ আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ‘উন্মুক্ত বিভাগ’। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি যে কোনো বয়সের বইপ্রেমী নিবন্ধনের মাধ্যমে এ বিভাগে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

আয়োজকদের এই উদ্যোগের ফলে বই পড়াকে শুধু স্কুল-কলেজ কেন্দ্রিক কার্যক্রম হিসেবে না রেখে বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা অন্য বয়সী পাঠক—সবাইকে একই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে একটি পাঠবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসন, শ্রীমঙ্গলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবের সমন্বয় সহযোগী হিসেবে রয়েছে শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব এবং পাঠ সহযোগী হিসেবে রয়েছে উত্তরণ।

শ্রীমঙ্গলের এই উদ্যোগের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—উৎসব শেষ হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস কতটা স্থায়ী হবে? কারণ পাঠাভ্যাস তৈরি কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক উৎসাহ, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং সহজলভ্য বইয়ের পরিবেশ।

তবে একই সময়ে ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে বই পড়ার একটি কাঠামোবদ্ধ কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। বিশেষ করে প্রতিটি ধাপে নতুন বই, পাঠ এবং মূল্যায়নের ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কেবল একটি বই পড়ে থেমে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।

শিক্ষক, অভিভাবক ও সংস্কৃতিসেবীদের মতে, নিয়মিত বই পড়লে শিক্ষার্থীদের ভাষাজ্ঞান ও কল্পনাশক্তি বাড়ার পাশাপাশি তৈরি হয় বিষয়কে ভিন্নভাবে দেখার ক্ষমতা। বই তাদের তথ্যের সঙ্গে পরিচয় করানোর পাশাপাশি প্রশ্ন করতে, যুক্তি খুঁজতে এবং নিজের মত গড়ে তুলতেও সহায়তা করে।

সেই জায়গা থেকেই শ্রীমঙ্গলের বইপড়া উৎসবকে শুধু ‘সেরা পাঠক’ নির্বাচনের আয়োজন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং এর মধ্য দিয়ে একটি উপজেলার বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে পাঠের অভ্যাসে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

২৫ হাজার শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছানোর এই উদ্যোগ কতটা দীর্ঘস্থায়ী পাঠসংস্কৃতি তৈরি করতে পারে, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনে। তবে শ্রীমঙ্গলে অন্তত একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে—পরীক্ষার জন্য নয়, নিজেকে গড়ার জন্যও কি বই পড়তে পারে একটি প্রজন্ম? ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ উদ্যোগটি সেই প্রশ্নেরই একটি বাস্তব উত্তর খোঁজার চেষ্টা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .