Logo
Logo
×
   

সারাদেশ

প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে হাজার কোটি টাকার খাসজমি দখলের অভিযোগ

Icon

কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম

প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে হাজার কোটি টাকার খাসজমি দখলের অভিযোগ

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে হাজার কোটি টাকা মূল্যের সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার মধ্যরাতে সৈকতে প্রবেশের ডান পাশে ১০ একরের বেশি জমি টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে একটি চক্র।

ওই এলাকায় থাকা দুই শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করে জমিটি দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হকাররা।

তাদের দাবি, জায়গা ছাড়তে চাপ দেওয়ার সময় একজন মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, সমুদ্র সৈকতসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এ জমির বর্তমান বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে জমিটির সঠিক পরিমাণ ও বাজারমূল্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সরেজমিন দেখা যায়, সুগন্ধা সৈকতের প্রবেশপথের ডান পাশে টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে বড় একটি এলাকা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য- শুক্রবার মধ্যরাতে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক সেখানে গিয়ে দ্রুততার সঙ্গে বেড়া নির্মাণ করেন। তাদের সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল সেখানে অবস্থান করছিল।

কর্মরত কয়েকজন শ্রমিকের ভাষ্য, এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর কাছের কয়েকজন ব্যক্তি ও অনুসারীরাই জায়গাটি ঘেরাও করেছেন। তবে তারা কারা, সেই বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো নাম বলতে রাজি হননি।

স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকাররা জানান, ঘেরাওয়ের আগে ওই এলাকায় দুই শতাধিক ভাসমান দোকান ছিল। রাতের মধ্যে দোকান সরিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের চাপ দেওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন হকারের সঙ্গে শ্রমিকদের কথা কাটাকাটি হয়। শনিবার বিকালে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হকাররা লাঠিসোটা নিয়ে প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ টিনের বেড়ার একটি অংশ ভাঙচুর করেন।

উচ্ছেদ হওয়া কয়েকজন হকারের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয় দেখানোর পাশাপাশি মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে তাদের জায়গা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

তাদের দাবি, মন্ত্রীর নাম শুনে অনেকে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।

তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নচিত্রও পাওয়া গেছে। সেই মন্ত্রীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদাত হোসেন রিপন নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জমি দখলের ছবি শেয়ার করে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি লিখেছেন- ‘মন্ত্রীর নির্দেশে সাগরের বালিয়াড়ি থেকে দোকান উচ্ছেদ করা হলো, অস্থায়ী কার্ড বাতিল করা হলো। ফলে হাজারখানেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কয়েক কোটি টাকা লোকসান হলো। এখন আবার মন্ত্রীর ভাইয়ের নাম ব্যবহার করে এস আলমের প্লট রাতের আঁধারে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হলো।’

তিনি আরও লেখেন- ‘প্রভাবশালী সেই মন্ত্রীর নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সরকারকে রাজস্ব দেওয়া কার্ডধারীরা দোকান করতে না পারলেও অবৈধভাবে ঠিকই বালিয়াড়িতে দোকান করছে। অন্যদিকে মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে খালি প্লট দখল করে মার্কেট তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দখলবাজরা।’

শাহাদাত হোসেন রিপন তার পোস্টে প্রশ্ন তোলেন- ‘মন্ত্রী কি আসলেই এসবের সঙ্গে জড়িত? নাকি উনার নাম ভাঙিয়ে উনার কোনো প্রতিনিধি এসব করছে, এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?’

এদিকে বিএনপির মিডিয়া সেলের জেলা প্রতিনিধি আলমগীর চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন।

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের এমপি অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না বলেন, আমি জেলার বাইরে আছি। বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছি। দয়া করে আপনারা মন্ত্রী মহোদয়কে বিষয়টি জানান।

নাম ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে ওই মন্ত্রীর পিএস হাসনাত আব্দুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, স্যারের নাম ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। যদি কেউ তার নাম ব্যবহার করে থাকে এবং জায়গাটি খাসজমি হয়, তাহলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ডিসি ব্যবস্থা নেবেন। আর যদি জায়গাটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, দখল করা জায়গাটি এস আলম গ্রুপের বাতিল হওয়া প্লটের অংশ। দখলকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মী রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর হোসেন সায়েম বলেন, সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখলের ঘটনায় জড়িত একজনকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই স্থানের মালিকানা বা ইজারার পক্ষে কোনো বৈধ নথি থাকলে তা জেলা প্রশাসক অথবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে উপস্থাপনের জন্য বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রশাসন কাউকে সরকারি জমি দখল বা ঘেরাও করার অনুমতি দেয়নি। অবৈধ অবকাঠামো ও টিনের বেড়া অপসারণের জন্য শনিবার বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিল। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে অবৈধ দখল বজায় রাখার চেষ্টা করা হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান যুগান্তরকে বলেন, দখলের বিষয়টি ইতোমধ্যে অনেকে আমাকে জানিয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে উচ্ছেদসহ এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে রোববার দুপুর পর্যন্ত দখল করা জমি থেকে টিনের বেড়া বা অবৈধ স্থাপনা অপসারণে কার্যকর কোনো অভিযান হয়নি বলে জানা গেছে।

সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় সরকারি জমি দখলের অভিযোগের পাশাপাশি হকার উচ্ছেদ, রাজস্ব আদায় করা অস্থায়ী কার্ড বাতিল এবং নতুন করে জমি ঘেরাওয়ের ঘটনায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জমিটি দখলমুক্ত করে প্রকৃত সরকারি মালিকানা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারা এর নেপথ্যে রয়েছে তা তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে যেন সরকারি খাসজমি দখল করতে না পারে, সেজন্য কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .