Logo
Logo
×
   

সারাদেশ

কৃত্রিম জিপিএ-৫ তৈরির কারখানা

কাদির মোল্লা স্কুলকে শিক্ষা বোর্ডের শোকজ

Icon

নরসিংদী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

কাদির মোল্লা স্কুলকে শিক্ষা বোর্ডের শোকজ

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসে চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের নেপথ্যে নিয়মবহির্ভূত কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনার সার্বিক সত্যতা যাচাই ও ব্যাখ্যা চেয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ পাঠিয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।

রোববার (১৬ আগস্ট) ঢাকা বোর্ডের এক অফিস আদেশে এ কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

শিক্ষা বোর্ডের জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ সাফল্য ও জিপিএ-৫ অর্জন নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি বোর্ডের নজরে আসার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ তদন্তে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস কর্তৃপক্ষকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে শিক্ষা বোর্ডে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া কারণ দর্শানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তলব করা হয়েছে।

সেগুলো হলো- ৯ম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের তথ্য, ভর্তি সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র, এসএসসির নির্বাচনি (টেস্ট) পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের তালিকা, চূড়ান্ত পর্যায়ে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণকারী শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছে।

অফিস আদেশে শিক্ষা বোর্ড স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, এটি একটি অত্যন্ত জরুরি নির্দেশনা। নির্দিষ্ট সাত কর্মদিবসের মধ্যে শোকজের জবাব দিতে ব্যর্থ হলে বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শিক্ষাবোর্ডের বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শতভাগ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়ার পর বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

অভিযোগ রয়েছে, জিপিএ-৫-এর শতভাগ হার বজায় রাখতে ও কৃত্রিম সাফল্য দেখাতে নির্বাচনি পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের ছাঁটাই করা বা ফরম পূরণ করতে না দেওয়ার মতো নিয়মবহির্ভূত কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। গণমাধ্যমে এসব সংবাদ প্রকাশের পর শিক্ষা বোর্ড বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে সত্যতা অনুসন্ধানে এ কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিল।

ঢাকা বোর্ড ও উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে নবম শ্রেণিতে মোট ৬০১ জন শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছিল। অথচ ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে মাত্র ৩৮২ জন। অর্থাৎ নবম থেকে দশমে পদার্পণ এবং শেষ পর্যন্ত টেস্ট পরীক্ষার ছাঁটাইয়ের শিকার হয়ে ঝরে পড়েছে ২১৯ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে গেছে তাদের একটি মূল্যবান বছর।

তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৪৮৩। এর মধ্যে ১০১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। তাই ৩৮২ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, যেসব শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদের অনেককেই নরসিংদীর সানবীন স্কুলে, ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে, নরসিংদী মডেল স্কুলে, সান শাইন মডেল হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। এসব স্কুলের মধ্যে নরসিংদীর সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে ৫০ জন। এদের মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে ৫ জন। এদের মধ্যে ৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। নরসিংদী মডেল স্কুলে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে ৪ জন। এদের মধ্যে ১ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সান শাইন মডেল হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে ১ জন পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

কৃত্রিম জিপিএ-৫ তৈরির কারখানা

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্কুলের শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার ধারাবাহিক ‘খ্যাতি’ ধরে রাখতে নরসিংদীর প্রখ্যাত নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের কর্তৃপক্ষ এক কৌশলী নীতি বাস্তবায়ন করে। দশম শ্রেণির টেস্ট বা নির্বাচনি পরীক্ষায় অদ্ভুত রকমের কঠিন ও জটিল প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়। খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অনুসৃত হয় অতি-কঠোর নীতি। যেখানে একটি উত্তরে সাধারণ মূল্যায়নে ১০ নম্বর পাওয়ার কথা, সেখানে দেওয়া হয় অর্ধেকেরও কম। উদ্দেশ্য একটাই, যেসব শিক্ষার্থী বোর্ডে নিশ্চিত জিপিএ-৫ পেতে পারে, কেবল তাদেরই চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য বাছাই করা। আর যারা কিছুটা পিছিয়ে বা মাঝারি মানের, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ‘অকৃতকার্য’ হওয়ার তকমা।

ঝরেপড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভ ও আকুতি

নির্বাচনি নামক পরীক্ষায় তথাকথিত ‘ফেল’ করে জীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে অনেক শিক্ষার্থী।

এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অশ্রুসজল চোখে জানায়, আমরা দুই বন্ধু ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একই সঙ্গে এই স্কুলে পড়েছি। নবম শ্রেণিতেও ভালো মার্কস পেয়ে দশম শ্রেণিতে উঠলাম; কিন্তু টেস্ট পরীক্ষার পর আমাকে বলা হলো আমি নাকি দুটো বিষয়ে ফেল করেছি। তাই ফরম পূরণ করতে দেওয়া হবে না। আমার বন্ধু আজ জিপিএ-৫ পেয়ে আনন্দে নাচছে, আর আমি ঘরের কোণে বসে কাঁদছি। আমার অপরাধটা কোথায় ছিল? স্কুলের সুনাম বাঁচানোর জন্য আমার জীবন থেকে একটা বছর কেন কেড়ে নেওয়া হলো?

সন্তানের এমন মানসিক বিপর্যয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অভিভাবকরাও। এক ছাত্রের বাবা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমার ছেলে পঞ্চম শ্রেণি থেকে টানা এই স্কুলে পড়ছে। সব ক্লাশে পাশ করে এসে হঠাৎ টেস্ট পরীক্ষায় এসে ফেল করল কিভাবে? যে ছেলেটাকে তারা পাঁচ বছর ধরে পড়াল, তাকে টেস্টে ফেল করিয়ে যদি বলা হয় সে এসএসসির যোগ্য নয়, তবে এই ব্যর্থতার দায় কি স্কুলের শিক্ষকদের নয়? ভালো ছাত্রদের পড়িয়ে জিপিএ-৫ বানানোয় কোনো বাহাদুরি নেই। এরা শুধু নিজেদের ব্যবসার প্রসারে আমাদের সন্তানদের স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।

আরেকজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা ডিসি অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। আকুতি জানিয়েছি; কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও প্রভাবের সামনে আমাদের কোনো কথাই টেকেনি। তারা মুচলেকা আর অদ্ভুত সব নিয়মের দোহাই দিয়ে আমার মেয়ের ফরম পূরণ করতে দেয়নি। মেয়েটা এখন মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছে যে ঘরের বাইরে যেতে চায় না।

শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এই ফলকেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। টেস্ট পরীক্ষার দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থী ছাঁটাই করা শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক চরম ব্যর্থতা। আর ব্যবসায়িক সাফল্যের বলি শিক্ষা।

‏নরসিংদীর এই স্বনামধন্য স্কুলের দেয়ালে ঝুলতে থাকা ট্রফি ও শতভাগ জিপিএ-৫-এর চকচকে ব্যানারের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে ২১৯টি পরিবারের আর্তনাদ। এ যেন এক নীরব ঘাতক ব্যবস্থা। যেখানে প্রতিষ্ঠানের ‘নাম ও সুনাম’ বজায় রাখতে বলি দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ।

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন বলেন, শোকজের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। আমাদের ৪৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৩ জন টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের বাদ দিয়ে ৩৮২ জন শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ নিয়ে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমাদের সব কাজের স্বচ্ছতা রয়েছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বোর্ডকে জবাব দেব।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .