Logo
Logo
×
   

সারাদেশ

যশোরের চাঁচড়া মৎস্য পল্লী

মহাসড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ হাট, দৈনিক দেড়-দুই কোটি টাকার লেনদেন

Icon

ইন্দ্রজিৎ রায়, যশোর ব্যুরো

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

মহাসড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ হাট, দৈনিক দেড়-দুই কোটি টাকার লেনদেন

যশোরের চাঁচড়া মৎস্য পল্লী। ছবি: যুগান্তর

দেশের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ মাছের পোনা সরবরাহ হয় যশোরের ঐতিহ্যবাহী চাঁচড়া মোকাম থেকে। ফাল্গুন থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত পোনা উৎপাদন ও বিপণনে মুখরিত থাকে মোকাম। এ বছর দীর্ঘ সময়ে অনাবৃষ্টি ও তীব্র দাবদাহে উৎপাদন ব্যাহত হলেও, সাম্প্রতিক বর্ষায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে এই মৎস্য পল্লী। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাকে করে রেণু ও পোনা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়, যার দৈনিক বাজারমূল্য দেড় থেকে দুই কোটি টাকা।

এদিকে শহরের মাগুরপট্টিতে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও কাজে আসছে না। ফলে মহাসড়কের পাশেই ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন মোকাম বসছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোনা বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণের সময় জায়গা নির্ধারণে ভুল হওয়ায় খামারি ও হ্যাচারি মালিকরা সেখানে যেতে আগ্রহী নন।

মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, যশোরে ৯৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জলাশয়ে বছরে ২ লাখ ৪১ হাজার টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হয়। বর্তমানে জেলার ৪২টি হ্যাচারিতে বছরে ৭২ হাজার কেজি রেণু এবং ৪ হাজার ৩২৭টি নার্সারিতে ২২৭ কোটি ১৩ লাখের বেশি পোনা উৎপাদিত হচ্ছে, যার মোট বাজারমূল্য ৭০০ কোটি টাকারও বেশি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টি বাড়তে থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর ঐতিহ্যবাহী মোকাম। রুই, মৃগেল, কাতলা, শিং, টেংরা, পাবদা থেকে শুরু করে ইলিশ ছাড়া প্রায় সব ধরনের মাছের রেণু ও পোনা পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাক, পিকআপ, বাস, এমনকি ট্রেনে করে এসব পোনা পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা ও ফরিদপুরসহ সারা দেশের জলাশয়ে।

মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে বসা এই হাটে বর্তমানে ৫০০ থেকে ৬০০ ব্যবসায়ী যুক্ত রয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মণ মাছের পোনা হাতবদল হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। আর বিশাল এ মোকামকে কেন্দ্র করে সরাসরি জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় ২ হাজার মানুষ।

বাগেরহাট থেকে আসা পাইকারি ক্রেতা আক্কাস আলী বলেন, চাঁচড়ার রেণু পোনার মান অনেক ভালো। এলাকায় ব্যাপক চাহিদা থাকায় এখান থেকে কিনে এলাকায় বিক্রি করি।

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ থেকে মোকামে আসা আল আমিন সরকার বলেন, এই মোকামে এসে মান ও দাম যাচাই করে পোনা ক্রয় করে নিজের খামারে চাষ করি, পাশাপাশি এলাকায় বিক্রি করি। এখানকার পোনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। 

আরেকজন ক্রেতা হায়দার আলী বলেন, সপ্তাহে তিনদিন এই মোকামে আসি। এখানকার পোনার মান ভালো। দামও নাগালের ভেতরে থাকে। এখান থেকে পোনা কিনে এলাকায় বিক্রি করি।

এদিকে ২০১৯ সালে যশোর শহরের চাঁচড়া মাগুরপট্টিতে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাছের পোনা বিক্রয়কেন্দ্রটি ব্যবসায়ীদের কোনো কাজে আসছে না। ভুল পরিকল্পনা, ত্রুটিপূর্ণ স্থাপত্যশৈলী ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে আধুনিক সুবিধার কেন্দ্রটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

চাঁচড়া এলাকার হ্যাচারি মালিক পল্লব বর্মণ বলেন, প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার পোনা বিক্রি হয়। অথচ মোকামের অবস্থা বেহাল। কাঁদা-জলে নাস্তানাবুদ অবস্থায় আছি আমরা। মহাসড়কের পাশে ঝুঁকি নিয়ে বেচাকেনা হচ্ছে।

আরেক হ্যাচারি মালিক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, পোনা বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ সঠিক জায়গায় হয়নি। এজন্য সেখানে কেউ যেতে চায় না। সেখানকার পরিবেশও ব্যবসাবান্ধব নয়। কারণ মাছের পোনার হাপা (পোনা সংরক্ষণ পুকুর) দরকার হয়। হাপায় রেখেই মোকামে বিক্রি করতে হয়। এতে পোানা বেশি সময় জীবিত রাখা যায়, যে সুবিধা এই পোনা বিক্রয় কেন্দ্রে নেই।

এ বিষয়ে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, দেশের চাহিদার সিংহভাগ রেণু পোণা সরবরাহ করছে যশোরের চাঁচড়ার খামারিরা। তাদের জন্য আধুনিক মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু খামারিদের বিক্রয় কেন্দ্রে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তারা ঝুঁকি নিয়ে সড়কের পাশেই বিক্রি করছেন। তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে বিক্রয় কেন্দ্রে আনার চেষ্টা চলছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম