বিএনপি কর্মীকে হত্যা-লাশ গুম
পাঁচ আ.লীগ নেতাকে অব্যাহতি, আসামিদের ভাই-ভাতিজারাই সাক্ষী
Advertisement
আনু মোস্তফা, রাজশাহী
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
আহাদ আলী ওরফে গোলকাজুল কাজল
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিএনপি কর্মী আহাদ আলী ওরফে গোলকাজুল কাজল (৩৬) অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুম মামলার মূল আসামি আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, বিপুল টাকার বিনিময়ে কাজলকে অপহরণ ও হত্যার পর লাশ গুমে জড়িতের অব্যাহতির সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ- পুলিশ মূল আসামিদের বাঁচাতে তাদের ভাই-ভাজিতাসহ নিকটাত্মীয়দের সাক্ষী করেছে; যাতে বিচারে সবাই বেকসুর খালাস পেতে পারেন। অথচ এসব সাক্ষীর নাম এজাহারে ছিল না।
নিহত গোলকাজুল ওরফে কাজল সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউপির চাকপাড়া গ্রামের আলতাফ হোসেন ফিরোজের ছেলে।
মামলার বাদী নিহত আহাদ আলী ওরফে গোলকাজুলের স্ত্রী লিমা বেগম পুলিশের চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি দাখিল করেছেন। পরবর্তী ধার্য তারিখে নারাজির শুনানি হবে।
নিহত কাজলের স্ত্রী লিমা বেগম এজাহারে বলেছেন- তার স্বামী কাজল গরুর ব্যবসা করতেন। বিএনপির একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। গ্রামে গরু কিনে সিটিহাটসহ ঢাকায় চালান করতেন। গত ১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় চরবাগডাঙ্গা বাজারে আসামি আলমগীর আলমের সঙ্গে কাজলের কথা কাটাকাটি হয়। ঘটনার একদিন পর ২ জানুয়ারি রাত সোয়া ৯টার দিকে আসামি হাসেম আলী কাজলকে ফোন করেন। হাসেম তাকে জানান- আলমের বাড়িতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ওমর আলী, জেলা তাঁতী লীগের সভাপতি নুরুল মেম্বার, আওয়ামী লীগ কর্মী আতাবুর রহমান সেন্টু, আলমসহ অনেকেই আছেন। তোমার সঙ্গে আলমের ঝামেলাটা তারা আপস করে দেবেন বলে তোমাকে নিতে পাঠিয়েছেন। এ সময় কাজল তার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করেন; কিন্তু পীড়াপীড়ির একপর্যায়ে স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাসেমের মোটরসাইকেলে চলে যান কাজল।
স্ত্রী লিমা বেগম অভিযোগে বলেন, কাজল যাওয়ার আধঘণ্টা পর আমি তার মোবাইল নাম্বারে ফোন দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে আসামি আলম ও হাসেমের নাম্বারে ফোন করি; কিন্তু তাদের ফোনও বন্ধ পাই। এভাবেই স্বামীর ফিরে আসার আশায় চরম উদ্বেগের সঙ্গে রাত কাটে। পরদিন সকালে আমি আত্মীয়স্বজন নিয়ে আলমের বাড়িতে যাই স্বামীর খোঁজে। তখন আলম আমাদের জানান, রাতেই তোমার স্বামীর ঝামেলাটা মীমাংসা হয়ে গেছে। চেয়ারম্যান ওমর আলী ও নুরুল মেম্বার, নেজামসহ সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষে চলে গেছেন। তোমার স্বামীও রাতে চলে গেছেন।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, স্বামীর খোঁজ না পেয়ে সম্ভাব্য সবখানে খোঁজ করি; কিন্তু কোথাও তার খোঁজ না পেয়ে ৪ জানুয়ারি সদর থানায় অভিযোগ দিতে যাই। আমি পুলিশ কর্মকর্তাদের বলি আমার স্বামীকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে। আপনারা অন্তত লাশটা উদ্ধার করুন; কিন্তু রহস্যজনক কারণে পুলিশ অভিযোগ না নিয়ে ফিরিয়ে দেন।
কাজল অপহরণ ও গুমের ঘটনাটি নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে উত্তেজনা দেখা দিলে ৮ জানুয়ারি পুলিশ আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলী, নুরুল মেম্বার, জোহাক, নাজমুল গুদা, নেজাম উদ্দিন, আলমগীর আলম, হাসেম আলীসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ৮ জনসহ ১৬ জনকে আসামি করে অপহরণ ও গুমের মামলা রেকর্ড করেন।
বাদীর আরও অভিযোগ পুলিশ মামলা রুজু করলেও তার স্বামীকে উদ্ধারের কোনো চেষ্টাই করেননি। পুলিশ লোক দেখানোভাবে বাচ্চু নামে একজনকে আটক করলেও তার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই ৫৪ ধারায় চালান করা হয়। একদিন পরই সে জামিনে বেরিয়ে আসে। এছাড়া এজাহারভুক্ত আসামিদের কাউকেই গ্রেফতারের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি। অথচ আসামিদের সঙ্গে পুলিশকেও ঘুরে বেড়াতেও দেখা গেছে।
জানা গেছে, অপহরণের ১৯ দিন পর গত ২০ জানুয়ারি আলাতুলির মধ্যচরে পদ্মা নদী থেকে কাজলের গলিত লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কাজলের মুখের দুই পাটি দাঁত ভাঙ্গা ছিল। শরীরের নিচের দিকে বেশ কয়েকটি বড় ক্ষতও রয়েছে। মুখ ও মাথা ছিল থেঁতলানো। মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হরেন্দ্রনাথ দেবদাস ওই সময় জানিয়েছিলেন কাজলকে হত্যার পর লাশ কোথাও মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও শক্ত কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করে ও শ্বাসরোধে কাজলকে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে অপহরণ ও গুমের মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাদীকে অবহিত না করেই এজাহারভুক্ত আসামি আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলী, নুরুল মেম্বার, নাজমুল হক গুদা, নেজাম উদ্দিন ও আতাবুরকে অব্যাহতির সুপারিশ দিয়ে গত ২৫ জুলাই চার্জশিট জমা করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রাজ্জাক।
অন্যদিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে আলমগীর আলম, হাসেম আলী, জোহাক আলী, ফরিদ উদ্দিন ও কামরুল বাচ্চুকে। অভিযুক্তরা সবাই পলাতক আছেন।
এদিকে মামলার বাদী লিমা বেগম অভিযোগে জানান, চার্জশিট তোলার পর দেখলাম ১৬১ ধারায় আমার একটা জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। নিচে আমার স্বাক্ষরও আছে; কিন্তু বাস্তবে পুলিশ আমার সঙ্গে কথাই বলেনি। আমার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। আমার স্বামীর ভাই জাহাঙ্গীরের স্বাক্ষরও জাল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। আমার স্বাক্ষরের ফরেনসিক পরীক্ষা করলেই আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে।
খোঁজ নিয়ে আরও দেখা গেছে, তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটিতে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করেছে। তার মধ্যে অব্যাহতিপ্রাপ্ত নুরুল মেম্বারের আপন ভাই আমিনুল, আপন চাচা বাবলু ও আপন চাচাতো ভাই কামালকে সাক্ষী করা হয়েছে। অব্যাহতিপ্রাপ্ত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলীর আপন চাচাতো ভাই মফিজুল ও ব্যক্তিগত লোক শরিফুলকে সাক্ষী করা হয়েছে।
চার্জশিটভুক্ত ১নং আসামি আলমের আপন চাচাতো ভাই কামরুজ্জামান টুটুল ও সিরাজকে সাক্ষী করা হয়েছে। অব্যাহতিপ্রাপ্ত নাজমুল গুদার আপন ভাই বাবলু, আপন ভাতিজা আমিনুল ও কামালকে সাক্ষী করা হয়েছে। অন্যদিকে অব্যাহতি পাওয়া নেজাম উদ্দিনের আপন ভাই বাবলু, আপন ভাতিজা কামাল ও আপন চাচাতো ভাইয়ের ছেলে আমিনুলকে সাক্ষী করা হয়েছে।
বাদীর আইনজীবী এমদাদুল হক লুটু বলেন, কাজলকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে প্রথমে অপহরণ ও পরে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। এজাহারের কোনো আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করেনি। পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও চার্জশিটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। অত্যন্ত দায়সারা তদন্ত করে তদন্ত কর্মকর্তা মনগড়া একটা চার্জশিট দিয়েছেন; যেখানে মুল অভিযুক্তদেরই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আমরা নারাজি করেছি। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্ত দাবি করেছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রাজ্জাক জানান, তিনি তদন্তে যা পেয়েছেন সেভাবেই চার্জশিট দিয়েছেন। অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামিদের ভাই ভাতিজাকে সাক্ষী করার বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা স্বাধীন। তবে কাজল হত্যা মামলার তদন্তে কোনো অসঙ্গতি হয়ে থাকলে সেটা খতিয়ে দেখা হবে।
