সাতক্ষীরায় দিয়াশলাই কাঠি আর ১০ কেজি রেশমি সুতায় দুর্গা
Advertisement
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম
সাতক্ষীরায় দিয়াশলাই কাঠি আর ১০ কেজি রেশমি সুতায় দুর্গা প্রতিমা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগুন জ্বালানোর দিয়াশলাই কাঠিই এবার হয়ে উঠেছে দুর্গার অলংকার। দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি আর ১০ কেজিরও বেশি রঙিন রেশমি সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ব্যতিক্রমী দুর্গা প্রতিমা।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মণ্ডপে তৈরি হওয়া এই প্রতিমা ইতোমধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে স্থানীয়দের মধ্যে। নির্মাণকাজ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার বিভিন্ন মণ্ডপে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় রঙের কাজ, কোথাও চলছে সাজসজ্জা। এর মধ্যেই ব্রহ্মরাজপুরের এ আয়োজন আলাদা করে নজর কেড়েছে। মাটির তৈরি প্রতিমার শরীরজুড়ে নিখুঁতভাবে বসানো হচ্ছে দিয়াশলাই কাঠি। সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে রঙিন রেশমি সুতা। কাঠি ও সুতার নকশায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবীর অলংকার।
প্রতিমার এই বিশেষ সাজ তৈরিতে কাজ করছেন চারজন দক্ষ কারিগর। টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন তারা। কাঠি ও সুতার কাজ শেষ হলে প্রতিমায় রঙের প্রলেপ দেওয়া হবে। এরপরই পূর্ণতা পাবে দেবীর রূপ।
ব্যতিক্রমী এ প্রতিমার মূল রূপকার প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার। তিনি জানান, ২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে একটি কারখানায় দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শেখেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই এবার সাতক্ষীরায় নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করেন।
নবদ্বীপ সরকার বলেন, ২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় আমরা মোট চারটি প্রতিমা তৈরি করছি। এর মধ্যে দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমাটিই আমাদের মূল আকর্ষণ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভিন্নধর্মী কিছু করার চেষ্টা করেছি।
দিয়াশলাই কাঠি ব্যবহারে অগ্নিঝুঁকি নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তবে শিল্পীর দাবি, প্রতিমায় ব্যবহারের আগে বিশেষ মেডিসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন বাতাসে থাকায় কাঠির বারুদের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এ প্রতিমায় আগুন লাগার আশঙ্কা নেই।
ব্রহ্মরাজপুরের পূজা কমিটির এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন অবশ্য নতুন নয়। গত বছর ধান দিয়ে তৈরি দুর্গা প্রতিমা ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা এসেছিলেন সেই প্রতিমা দেখতে। গত বছরের সেই সাফল্যই এবার আরও নতুন কিছু করার সাহস জুগিয়েছে পূজা কমিটিকে।
ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ বলেন, গত বছর ধানের প্রতিমা দেখতে প্রচুর মানুষ এসেছিলেন। সেই সাড়া থেকেই এবার ভাস্করের সঙ্গে আলোচনা করে দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধু শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাবদ প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আয়োজনটি ব্যয়বহুল হলেও ব্যতিক্রমী কিছু করতে পেরে আমরা আনন্দিত।
প্রতিমার নির্মাণকাজ দেখতে আসা স্থানীয় দর্শনার্থীদের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তাদের কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন।
স্থানীয় কয়েকজন দর্শনার্থী বলেন, গত বছর ধানের প্রতিমা দেখার পর এবার দিয়াশলাই কাঠির প্রতিমা দেখে তারা মুগ্ধ। প্রতিদিন প্রতিমার নতুন নতুন রূপ দেখতে মণ্ডপে আসছেন তারা।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদও এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ব্রহ্মরাজপুরে গত বছর ধানের প্রতিমা তৈরি করে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। এবার দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে যে প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে, সেটিও দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক। আশা করছি, এটি দেখতে সাতক্ষীরার বাইরের দর্শনার্থীরাও আসবেন।
পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে সাতক্ষীরা জেলায় ৫৮৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার ৬০০টিরও বেশি মণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। জেলার শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, তালা ও কলারোয়াসহ বিভিন্ন উপজেলার মণ্ডপে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।
ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জায় স্থানীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতাও এবার উৎসবকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। এর মধ্যে ব্রহ্মরাজপুরের দেড় লাখ দিয়াশলাই কাঠি ও ১০ কেজি রেশমি সুতায় সাজানো দুর্গাপ্রতিমা ইতোমধ্যে পরিণত হয়েছে সাতক্ষীরার শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণে।
