Logo
Logo
×
   

সারাদেশ

রংপুরে চার খুনের ঘটনায় সাক্ষী শান্ত দাসের জবানবন্দি

Icon

রংপুর ব্যুরো

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৪ পিএম

রংপুরে চার খুনের ঘটনায় সাক্ষী শান্ত দাসের জবানবন্দি

রংপুরে আলোচিত শিক্ষক চক্রবর্তী পরিবারের চার খুনের ঘটনায় সাক্ষী শান্ত দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। খুনের আগে শান্ত দাসের কাছেই মোবাইল বন্ধক রেখে ইয়াবা কিনেছিল সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস।

রোববার বিকালে রংপুর মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক রফিকুল ইসলামের আদালতে মাদককারবারি শান্ত দাস এ জবানবন্দি দেন।

এর আগে পুলিশের কাছে জবানবন্দিতে শান্ত জানান, ২১ আগস্ট রাতে তিন ধাপে ৫টি ইয়াবা কিনেন তারা। সিদ্ধার্থ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় শান্তর কাছে মোবাইল বন্ধক রেখে ইয়াবাগুলো কেনেন। পরদিন বিকালে টাকা দিয়ে মোবাইল ফোন ফিরিয়ে নিয়েছিল সিদ্ধার্থ। যে টাকা গণপতির বাসা থেকে লুট করেছিল তারা। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে আদালতকে সে একই বক্তব্য জানিয়েছে।

পুলিশ জানায়, শান্তর নামে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলেও মামলা নেই। এছাড়া তাকে আটকের সময় কোনো মাদকও পাওয়া যায়নি। যে কারণে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি। তবে তিনি সেবনের সঙ্গে জড়িত।

এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাস নামে দুইজনকে ২৩ আগস্ট ভোরেই গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা সেদিন রাতেই রংপুর মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচার রফিকুল ইসলামের কাছে খুনের কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ হত্যার মোটিভ এখনো জানতে পারেনি। হত্যার দায়ে গ্রেফতার দুই আসামির ডিএনএ এর নমুনা এখনো পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়নি। হত্যার শিকার চক্রবর্তী পরিবারের ৪ জনের ভিসেরা রিপোর্টের স্যাম্পল ঘটনার ১২ দিন পর পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সংস্থার অনেক বক্তব্য বিভ্রান্তিকর হওয়ায় শেষপর্যন্ত মামলার তদন্তে প্রকৃত হত্যাকারীর মুখোশ উন্মোচন হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, আসামিরা ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠার পর ভোরে তাদের দেখে ফেলেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে প্রথমে তাকে এবং পরে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে যায় তারা। তারা ৯টি ইয়াবা সেবন করেছিল। তাই নেশাগ্রস্ত থাকায় এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে গ্রেফতার দু’জন সিদ্ধার্থ দাস(২২) ও মুগ্ধ দাস(২৪)।

ময়নাতদন্তে ৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে পারে- এমন আশঙ্কায় আসামিরা নিচতলায় গিয়ে একটি পুরোনো প্লাস পান। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা।

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যের সঙ্গে হত্যার ঘটনা প্রবাহের অমিল

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যের সূত্র ধরে দেখা যাক- ঘটনার রাতে কী ঘটনাপ্রবাহ যুগান্তরের অনুসন্ধান উঠে এসেছে। প্রতিবেশীর একজনের বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়- গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাস (২২) ভোরবেলা ৪টা ৩৮ মিনিটে কোথাও যাচ্ছিলেন। আবার ৪টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত বাড়ির সামনের গলি পথে ফিরে আসেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন ছিল, ৪ জনের পাকস্থলিতে খাবার ভরা ছিল। তা হলে হত্যার দুই ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা আগে তারা খেয়েছিল। ভোর রাতে হত্যার ঘটনা ঘটলে পাকস্থলিতে খাবার থাকার কথা নয়। এটি ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের স্পষ্ট বক্তব্য।

খুনের শিকার আগামী চক্রবর্তীর ঘটনার রাতে বন্ধুর ফোনে কথোপকথনের সময় ভোর ৫টা ৫৫ মিনিট। সেখানে সে বলছিল রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় খুব কষ্টে রাত কেটেছে। পুলিশের তথ্য হত্যার পর সিসিটিভি ফুটেজ যাতে না পায় সেজন্য বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করেছিল হত্যাকারী দুইজন। কিন্তু ঘটনা প্রবাহ বলছে হত্যার আগে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। এসব ঘটনাপ্রবাহ পুলিশের তদন্তের বক্তব্যকে সমর্থন করে না। অনেক তথ্য বিভ্রাট ও অমিল রয়েছে।

তাছাড়া মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কমিশনার তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, এটি যেহেতু খুবই স্পর্শকাতর মামলা আমরা আগাম কোনো তথ্য মিডিয়া প্রকাশ করে মামলার গতিকে বাধাগ্রস্ত বা বিভ্রান্ত করতে চাই না।

হত্যার মোটিভ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি

এদিকে হত্যার সঙ্গে গ্রেফতার দু’জনই জড়িত বলে যদিও পুলিশ প্রাথমিকভাবে বলেছিল তা নিয়েও এখন স্বয়ং রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা ওসি জিন্নাত আলী সন্দিহান। তিনি স্বীকার করেছেন- তার ধারণা আরও কোনো ঘটনা রয়েছে এবং অন্য কেউ জড়িত আছে তা সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আড়াল করছে। তাই আগে থেকেই বলা যাচ্ছে না এই দুইজনেই চূড়ান্ত হত্যাকারী। তাই সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। যারা ঘটনার পর গা ঢাকা দিয়েছে তাদের একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার মোটিভ সম্পর্কে জানার জন্য বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

উল্লেখ্য, গত ২১ আগস্ট ভোরে রংপুর মহানগরীর দাসপাড়ায় (মাছুয়াপাড়া) তালাবদ্ধ নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে সদ্য মাস্টার্স করা আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী, ছেলে জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম