অডিও ভাইরাল
অভিযোগ তদন্তে ১০ হাজার টাকা ঘুস দাবি এসআইয়ের, দিলেন বিকাশ নম্বর
কেএম রায়হান কবীর, শরীয়তপুর
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম
জাজিরা থানা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শরীয়তপুরের জাজিরায় পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে ১০ হাজার টাকা ঘুস দাবির অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
কথোপকথনের একপর্যায়ে ওই পুলিশ সদস্য নিজের বিকাশ নম্বরটিও উল্লেখ করে টাকা পাঠাতে বলেন। এ ঘটনায় দোষীর বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ওই নারী ও তার পরিবার। জাজিরা থানার এসআই রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের মালেক শেখের মেয়ে ইতি আক্তারের সঙ্গে জাজিরা পৌরসভার সোনার দেউল এলাকার নুর মোহাম্মদ শেখের ছেলে সাত্তার শেখের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিভিন্ন সময়ে যৌতুক দাবিতে ইতিকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। বিষয়টি নিয়ে পারিবারিক ও স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ হলেও সমাধান হয়নি। সর্বশেষ ১৭ আগস্ট রাতে স্বামীসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
এ ঘটনায় ৪ সেপ্টেম্বর ইতি আক্তার তার স্বামী সাত্তার শেখসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পারিবারিক বিরোধ, শারীরিক নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে জাজিরা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগটি থানায় গ্রহণের পর ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় জাজিরা থানার এসআই রফিকুল ইসলামকে। অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে বাদীপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসআই রফিকুল ইসলাম ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে ওই নারীর এক নিকটাত্মীয় সৌদি প্রবাসী দুলাল মোড়লের সঙ্গে রফিকুল ইসলামের ফোনে কথা হয়।
সেখানে কথোপকথনের একপর্যায়ে টাকা পাঠানোর জন্য পুলিশ সদস্য রফিকুল ইসলাম তার বিকাশ নম্বরটি দেন। কথোপকথনের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগী ওই নারীর দাবি, পুলিশ সদস্যকে চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দেওয়ায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করছেন না।
ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের কথোপকথনটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
দুলাল মোড়ল: রফিকুল ভাই?
এসআই রফিকুল ইসলাম: জ্বি।
দুলাল মোড়ল: আপনে জাজিরা থানায় আছেন? ওই ব্যাপারটার তদন্তে কে যাবেন, আপনি?
এসআই রফিকুল ইসলাম: হ্যাঁ
দুলাল মোড়ল: আপনি যে খরচের কথা বলছিলেন, কত দিমু? কত দেওয়া লাগব? অর (ইতি) কাছে তো টাকা নাই। টাকা হেনতে (এখান থেকে) দেওয়া লাগব আমার। কত দেওয়া লাগব?
এস আই রফিকুল ইসলাম: ১০-এর মতো দিয়া দেন।
দুলাল মোড়ল: ১০ হাজার?
এসআই রফিকুল ইসলাম: হু।
দুলাল মোড়ল: আপনার বিকাশ নম্বর কোনডা? নম্বরটা একটু দেন।
এসআই রফিকুল ইসলাম: (ফোন নম্বর দেন)
দুলাল মোড়ল: একটু কম দেই? ১০ হাজার টাকা বেশি হইয়া যায় না?
এসআই রফিকুল ইসলাম: ধইরা আনতে, মিটমাট করতে আমাগো খরচ আছে না?
দুলাল মোড়ল: ধইরা আনার দায়িত্ব তো আপনাগোই। আপনি কি সেকেন্ড অফিসার নাকি এসআই?
এসআই রফিকুল ইসলাম: এসআই, উপপরিদর্শক।
এরপর টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কল কেটে দেন দুলাল মোড়ল।
ভুক্তভোগী ওই নারী অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের পর থেকে আমার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন চালাত। কয়েক দিন আগে তারা আমাকে মারধর করলে আমি থানায় লিখিত অভিযোগ করি। আমার অভিযোগটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এসআই রফিকুল স্যারকে। তিনি আমার কাছে টাকা চাইলে আমি তাকে বলি, আমার এক ভাই প্রবাসে থাকেন, তিনি টাকা দেবেন। পরে তার সঙ্গে কথা বলে বিকাশ নম্বর দেন। আমার ভাই তাকে টাকা না দেওয়ায় আমাদের কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। ঘটনার তদন্তও ঠিকভাবে করছে না। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।
ভুক্তভোগীর মা খাদিজা বেগম বলেন, আমাদের কাছে টাকা চাইলে পুলিশকে বলি, আমাদের কাছে টাকা নাই। আমার ভাতিজা দুলাল বিদেশ থাকে, সে টাকা দেবে। পরে দুলাল ওই পুলিশকে টাকা না দেওয়ায় আমার মেয়ের ঘটনার কোনো সমাধান করে দেয় নাই। আমরা থানায় গেলেও তারা আমাদের গুরুত্ব দেয় না।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এসআই রফিকুল ইসলামের মুখোমুখি হলে তিনি টাকা দাবির বিষয়টি অস্বীকার করেন। একপর্যায়ে বিষয়টি ওসি জানেন বলে বক্তব্য না দিয়ে নিজ কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান।
বিষয়টি নিয়ে জাজিরা থানার ওসি সালেহ আহম্মেদও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দোহাই দিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে তদন্তসাপেক্ষে এ বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাকারিয়া রহমান। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। এটি খতিয়ে দেখছি। সত্যতা পেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
