চাঁদা না পেলেই মৃত্যু পরোয়ানা
চিকিৎসককে হত্যার হুমকি দিয়ে আবারও আলোচনায় সন্ত্রাসী রায়হান
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম
মোহাম্মদ রায়হান
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান এখন আরও বেপরোয়া। চাঁদার দাবিতে তার কাছ থেকে প্রতিদিনই কেউ না কেউ পাচ্ছেন মৃত্যুর পরোয়ানার হুমকি। ব্যবসায়ী, প্রবাসী, ধনাঢ্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে কেউই বাদ যাচ্ছেন না তার হুমকি-ধমকি থেকে।
সর্বশেষ হাটহাজারীর একজন গরিবদরদী চিকিৎসকের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে রায়হান। চাঁদা না দিলে তাকে ১০০ পুলিশের সামনে হলেও হত্যার হুমকি দিয়েছে। ইতোমধ্যে রায়হান ও তার বাহিনীর হাতে বেশ কিছু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। চাঁদা না পেয়ে কিংবা আধিপত্য বিস্তারের জেরে নিশানা করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে।
রায়হানের অন্যতম সহযোগী ডেভিড ইমন, গলাকাটা মোবারক এবং ধামা ইলিয়াছ গ্রেফতার হওয়ার পর ধারণা করা হচ্ছিল রায়হান হয়তো এবার কিছুটা দুর্বল হবে; কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাকে নিয়ে প্রশাসন বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছেন, রায়হানসহ তার সহযোগীরা যদি ভালো হতে চায় তাদের সুযোগ দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের হয়ে তার অনুসারী ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন, রায়হান আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন ও ধামা ইলিয়াসসহ ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের অনেকে এখন কারাগারে। এখন একক নেতৃত্ব দিচ্ছে ভয়ংকর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান। এখন এই সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে বড় বড় ব্যবসায়ী, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সাবেক এমপি, শিল্পপতিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার, বিদেশি নাম্বার থেকে ফোন করে টার্গেট ব্যক্তিদের আলটিমেটাম দিয়ে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। যারা চাঁদা দিচ্ছেন না; তাদের বাসাবাড়িতে গিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলিবর্ষণ করে দেখানো হচ্ছে ভয়ভীতি। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি ঘিরে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গেও তাদের তার বাহিনী জড়াচ্ছে সংঘর্ষ।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ বাণিজ্য, কন্ট্রাক্ট কিলিংয়েও জড়িয়ে পড়েছে সাজ্জাদ বাহিনী। চট্টগ্রাম মহানগরী ও উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীতে ৫ আগস্টের পর অন্তত ২৯টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। যার বেশিরভাগের নেতৃত্বেই ছিল এই সন্ত্রাসী বাহিনী।
গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় সংঘটিত বহুল আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। পরে গত ২২ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে গ্রেফতার করে আদালতের অনুমতি নিয়ে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ধামা ইলিয়াছ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের মজুত এবং সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করে গত ২৯ জুলাই যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।
ওই দিন শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড রায়হানকে ধরতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অভিযান চালানো হয়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে রায়হান একটি বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
এ ঘটনার পর চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেছিলেন, পালিয়ে গেলেও দোজখ দেখে ফেলেছে সন্ত্রাসী রায়হান। সে ছাদ থেকে লাফিয়ে অলৌকিকভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও এ ধরনের সন্ত্রাসীদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর গরিবের চিকিৎসক হিসেবে খ্যাত ডা. এমওয়াইএফ পারভেজের কাছে প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে রায়হান। বিদেশি নাম্বার থেকে প্রথমে ফোনে চাঁদা দাবি করে। ফোন রিসিভ না করায় পরে মেসেজ পাঠিয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে। চাঁদা না দিলে রোগী সেজে তার চেম্বারে গিয়ে ১০০ পুলিশ থাকলেও গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ডা. পারভেজের বাড়ি হাটহাজারীর চিকনদন্ডি ইউনিয়নে। তিনি হাটহাজারীর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমানবাজারে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চেম্বার করেন এবং রোগী দেখেন। এরপর থেকে আবারও আলোচনায় আসে এই রায়হান।
রায়হানের বাড়ি রাউজান উপজেলার পূর্ব রাউজান গ্রামে। তার পিতার নাম বদিউল আলম। হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় কারাগারে গিয়ে চট্টগ্রামের আলোচিত ‘সন্ত্রাসী’ ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় হয় রায়হানের। গত বছরের ৫ আগস্টের পর দুজন কারাগার থেকে জামিনে বের হন। এরপর ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে উঠে রায়হান। সাজ্জাদ সম্প্রতি আবারও কারাগারে গেলে তার অস্ত্রভাণ্ডারের দেখভাল করছেন এই রায়হান।
কথা কাটাকাটির জেরে কিংবা ছোটখাটো বিষয়ে খুন করতে দ্বিধা করছে না খুনিরা। প্রকাশ্যে গুলি করে বা ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নগরী ছাড়াও গত এক বছরে চট্টগ্রামের চার উপজেলায় বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি খুনই হয়েছে গুলিতে। অধিকাংশ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রায়হানকে আসামি করা হয়েছে। এত কিছুর পরও রায়হান তার নিজের ফেসবুক ওয়ালে নিজ হাতে পিস্তল দিয়ে গুলি ছোড়ার দৃশ্য ধারণ করে তা ছড়িয়ে দিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
