মাদকের টাকা জোগাতে এক গ্রামে ৪ পরিবারের ৫ শিশুসন্তান বিক্রি!
Advertisement
ফজলুল হক জোয়ারদার আলমগীর, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪০ পিএম
কটিয়াদী মডেল থানা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাদকের ভয়াল ছোবল ও দরিদ্রতা, অন্যদিকে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্মম বাস্তবতা। মাদক সেবনের জন্য টাকা জোগাড় করতে জন্মদাতা পিতা-মাতা নিজেদের শিশুসন্তান বিক্রিও করে দিয়েছেন। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ প্রশাসনসহ সর্বমহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে মাদক ক্রয়ের জন্য টাকা জোগাড় করতে এক গ্রামের চার পরিবারের পাঁচ শিশুসন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে এমন কর্মকাণ্ডে এলাকায় দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ।
জানা গেছে, দুলাল মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী ফারজানার নবজাতক ছেলেসন্তান ২ সেপ্টেম্বর ৬০ হাজার টাকা, জজ মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন তার দুই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া দুটি শিশুসন্তান ১ লাখ ৫০ হাজার ও ২০ হাজার টাকা, আসাদ মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন ৭৭ হাজার টাকা এবং মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে আসাদ মিয়ার সন্তান ২ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, সন্তানদের প্রথমে যাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ কেউ আবার অন্য জায়গায় আরও বেশি টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে এসব শিশুর বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রবাস থেকে আসা উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. ইকবাল হোসেন জানান, দীর্ঘদিন পর প্রবাস থেকে ছুটিতে বাড়ি এসে ঘরে ঘরে মাদকের ছড়াছড়ি দেখে হতবাক হয়ে গেলাম। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়সের নারী-পুরুষ মাদকাসক্ত। মাদক সেবনের জন্য টাকা জোগাড় করতে নিজেদের সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছেন। চার পরিবারের পাঁচটি শিশুসন্তান ইতোমধ্যেই বিক্রি করে দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সারা দেশে অন্য কোথাও আছে বলে শুনিনি।
চরপুক্ষিয়া গ্রামের জয়নাল মিয়া, বকুল মিয়া, বাবুল মিয়া, জামাল মিয়া, কালা চান, সখিনা, কালুমিয়া, নুরুন্নাহার ও গ্রামপুলিশ দুলাল মিয়াসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, গ্রামে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে না পেরে মাদকাসক্ত বাবা-মা তাদের সন্তানদের টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দিচ্ছেন। সেই টাকা দিয়ে মাদক ক্রয় ও সেবন করছেন তারা।
তারা আরও বলেন, আমাদের মহল্লার ছেলেমেয়েদের ভালো কোথাও বিয়ে দিতে বা করাতে পারি না। অনেকেই প্রকাশ্যে বলে ফেলেন এই গ্রামের সব বয়সের নারী-পুরুষ মাদকাসক্ত। আমরা নিজেরাও অসহায়, প্রতিবাদ করার সাহস পাই না। আমাদেরও ছোট ছোট সন্তান আছে। প্রতিবাদ করলে আমাদের সন্তানদেরও নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার ভয় রয়েছে। শিশুদেরও মাদকের সংস্পর্শে আনা হচ্ছে। এমনকি প্রায় পাঁচ বছরের শিশুকে মাদক সেবন করানোর অভিযোগ করেছেন তারা। অনেক বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী ছেলেমেয়ে একসঙ্গে মাদক সেবন করেন বলেও দাবি তাদের।
তারা বলেন, মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কথা বললে হামলা, হয়রানি কিংবা নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে অনেকেই সবকিছু দেখেও নীরব থাকছেন। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই, কিন্তু নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েই আমরা আতঙ্কে থাকি।
কটিয়াদী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এক ছাত্র জানায়, আমি আমার গ্রামের পরিচয় দিতে পারি না। উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে আমাদের বাড়ি শুনলেই লোকজন টিটকারি করে বলে তোরা মাদকাসক্ত। তোদের গ্রামের লোকজন মাদকের টাকা জোগাড় করতে নিজেদের ছেলেমেয়ে বিক্রি করে দেয়। এসব কথা বলে আমাদের সঙ্গে অনেকেই মিশতে চায় না। আমরা ভালোভাবে ও সুন্দর পরিবেশে বাঁচতে চাই।
কটিয়াদী মডেল থানা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। অথচ মাদকের বিস্তার ঠেকাতে দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রামের লোকজন।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় যদি মাদকের এমন বিস্তার ঘটে, তাহলে প্রত্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
তারা মাদকের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান, মাদকসেবী ও কারবারিদের শনাক্তকরণ এবং সন্তান বিক্রির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সন্তান বিক্রির অভিযোগ ওঠা পরিবারগুলোর সদস্যরা সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানান, উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে মাদকের ছোবল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাদক সেবনের টাকার জন্য বিভিন্ন সময়ে পাঁচটি শিশুসন্তান বিক্রি করে দেওয়ার কথা শুনেছি। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য সামাজিক ও প্রশাসনের সহায়তায় কাজ করব।
কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে দরিদ্রতা ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে তাদের ঔরসজাত সন্তানদের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। মাদক নির্মূলে আইনগত ব্যবস্থা ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
