Logo
Logo
×
   

Advertisement

সারাদেশ

৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ, ছুটিতে পুলিশ সদস্য

Advertisement

Icon

রাজশাহী ব্যুরো

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ, ছুটিতে পুলিশ সদস্য

প্রতীকী ছবি

Advertisement

চাঁপাইনবাবগঞ্জে অভিযানের নামে কোটি টাকা মূল্যের ৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে জেলা পুলিশের এক কনস্টেবলের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর ওই কনস্টেবল এক মাসের ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে গেছেন। 

আলোচিত এই কনস্টেবলের নাম জাকির হোসেন। তার বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামে।

অভিযোগে জানা গেছে, কনস্টেবল জাকির হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর পুলিশ ফাঁড়ির অধীনে অফিসার্স মেসে কর্মরত। গত ৮ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মরা পাগলা নদীর কালীনগর সেতুর কাছে স্বর্ণের চালানটি ছিনতাই করা হয়।

কোটি টাকার স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ ঘিরে ভেতরে ভেতরে জেলা পুলিশে তোলপাড় হলেও কনস্টেবল জাকিরের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ ও বিস্তারিত কলরেকর্ড থাকার দাবি করেছেন স্বর্ণের মালিক রাজশাহীর ব্যবসায়ী নিঝুম।

তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চকআলমপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীর মাধ্যমে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে দেওয়ার জন্য স্বর্ণগুলো পাঠিয়েছিলেন। ঘটনাস্থলে মোহাম্মদ আলী ওই ব্যবসায়ীর কাছে স্বর্ণগুলো হস্তান্তর করছিলেন। ঠিক ওই সময় কনস্টেবল জাকিরসহ দুজন মোটরসাইকেল যোগে সেখানে উপস্থিত হয়ে পুলিশ পরিচয়ে স্বর্ণ চালানটি ছিনতাই করেন বলে অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঘটনাস্থল সীমান্তের নিকটবর্তী একটি এলাকা। এই রুট দিয়েই সীমান্তপথে ভারতে স্বর্ণ পাচার হয়ে থাকে। গলানো এসব স্বর্ণ ভারতে পাচারের জন্য নেওয়া হয়েছিল বলে সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে। যদিও স্বর্ণ খোয়ানো ব্যবসায়ী নিঝুম পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে নিঝুম জানান, নগরীতে তার ভাইয়ের একটি জুয়েলারির দোকান আছে। যখন স্বর্ণের দাম কমে, তখন তারা কিনে রাখেন। দাম বাড়লে বিক্রি করেন। রাজশাহীর বাইরের কোনো জেলার স্বর্ণকারেরা অর্ডার করলে তখন স্বর্ণ পৌঁছে দেন। এমনই একটি অর্ডার সরবরাহ করতে গিয়ে তার স্বর্ণ ছিনতাই হয়েছে।

ব্যবসায়ী নিঝুম দাবি করেন, তিনি স্বর্ণ পাঠানো ও ছিনতাই হওয়ার পথের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি কনস্টেবল জাকিরের সঙ্গে তার ভগ্নিপতি ও ভাগ্নে নয়নের ফোনালাপের বিস্তারিত কলরেকর্ডও সংগ্রহ করেছেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী জাকিরের সঙ্গে তার ভগ্নিপতি ও ভাগ্নে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত বলে দাবি তার।

ঘটনার পর থেকে তিনি লুট হওয়া স্বর্ণ উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো উপায় বের করতে পারেননি।

নিঝুম আরও জানান, ঘটনার দিনটি ছিল শনিবার। তিনি তার ভগ্নিপতির হাতে ওই ৪০ ভরি স্বর্ণ তুলে দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দিতে বলেন। মরা পাগলা নদীর কালীনগর সেতুর কাছে তার ভগ্নিপতি ওই ব্যবসায়ীর কাছে স্বর্ণ চালান হস্তান্তরের সময় আকস্মিকভাবে নিজের অ্যাপাচি মোটরসাইকেলে একজন সহযোগীকে নিয়ে সাদাপোশাকে হাজির হন কনস্টেবল জাকির। পুলিশের লোক পরিচয়ে তিনি স্বর্ণ চালানটি ছিনতাই করেন। চিৎকার করলে স্বর্ণসহ চালান দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও দাবি করেন নিঝুম।

অভিযোগে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে ব্যবসায়ীর কাছে স্বর্ণ চালান হস্তান্তর হচ্ছিল, তার মাধ্যমে ছিনতাইয়ের ঘটনা জানতে পারেন নিঝুম। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে মহানন্দা সেতু হয়ে কালীনগর-মরা পাগলা পর্যন্ত সড়কের সাতটি স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেন তিনি।

এসব ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে কনস্টেবল জাকির নিজের মোটরসাইকেল যোগে ঘটনাস্থলের দিকে যাচ্ছেন। জাকিরের মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করা না গেলেও জাকিরকে শনাক্ত করা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নিঝুমের অভিযোগের সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হয় কনস্টেবল জাকিরের সঙ্গে। তিনি স্বীকার করেন, ঘটনার দিন ও সময়ে মরা পাগলা নদীর ওপর কালীনগর ব্রিজের দিকে গিয়েছিলেন। তবে তার দাবি, এমনিতেই ঘুরতে গিয়েছিলেন। স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার কোনো যোগ নেই। নিঝুম কোনো কারণ ছাড়াই তাকে জড়ানোর চেষ্টা করছেন।

কনস্টেবল জাকিরের আরও দাবি, ঘটনার পর বিষয়টি মীমাংসার কথা হয়েছিল। এটি তাদের নিজেদের মধ্যকার ঘটনা। নিঝুমের ভগ্নিপতি ও ভাগ্নে না বসায় মীমাংসা হয়নি।

এদিকে কনস্টেবল জাকির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করলেও স্বর্ণ বাহক নিঝুমের ভগ্নিপতি ও ভাগ্নের কলরেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘটনার আগের দুই দিন, ঘটনার দিন ও ঘটনার পরের দিন নিঝুমের ভগ্নিপতি মোহাম্মদ আলী ও ভাগ্নে নয়নের সঙ্গে কনস্টেবল জাকিরের অসংখ্যবার রহস্যজনক ফোনালাপ হয়েছে।

এর মধ্যে ঘটনার দুই দিন আগে, গত ৬ আগস্ট, জাকির তার ব্যক্তিগত নম্বর থেকে নয়নের নম্বরে ফোন করে মোট ১২ বার দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেন। একইভাবে ৭ আগস্ট একই নম্বরে জাকির কথা বলেছেন মোট ২৫ বার। ওই দিনই জাকির স্বর্ণ বাহক মোহাম্মদ আলীর (নয়নের বাবা) নম্বরে কথা বলেন সাতবার।

ঘটনার দিন ৮ আগস্ট জাকির ও নয়নের মধ্যে কথা হয়েছে ১০ বার। একই দিন নয়নের বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে জাকিরের কথা হয়েছে ১১ বার। মোহাম্মদ আলীও স্বর্ণ চালানটি পৌঁছে দেওয়ার দিন জাকিরের সঙ্গে ১০ বার কথা বলেন।

অন্যদিকে ফোনকলের লোকেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বর্ণ নিয়ে মোহাম্মদ আলী যখন কালীনগর ব্রিজের আশপাশে ছিলেন, তখন ওই এলাকাতেই অবস্থান করছিলেন কনস্টেবল জাকির। তখনও তাদের মধ্যে কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে।

এই সন্দেহজনক কথোপকথনের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কনস্টেবল জাকির শুধু নয়নের সঙ্গে কথা বলার কথা স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, অনেক দিন ধরেই নয়নের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। তার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হয়, দেখা হয়। তবে নয়নের বাবার সঙ্গে মোবাইলে কী প্রয়োজনে এতবার কথা বলেছেন—এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান জাকির।

এদিকে ঘটনার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় স্বর্ণ বাহক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরেই তিনি সংযোগ কেটে দেন।

পরে মোহাম্মদ আলীর ছেলে নয়ন বলেন, তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে একটি লাইব্রেরি চালান। রাজশাহীতে পড়াশোনা করেন। স্বর্ণ ছিনতাইয়ের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ‘আমার মামা কেন আমাকে ও বাবাকে জড়াচ্ছেন বুঝতে পারছি না’—বলেন নয়ন।

কনস্টেবল জাকিরের সঙ্গে তার এত যোগাযোগের কারণ জানতে চাইলে নয়ন দাবি করেন, তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের কারণে কথা হয়।

এদিকে আলোচিত ঘটনাটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবহিত হলেও ‘কেউ অভিযোগ করেনি’—এমন অজুহাতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ওসি একরামুল হোসাইন জানান, ঘটনার বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। তিনি কিছুই জানেন না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, ঘটনার বিষয়ে জেলা পুলিশ অবগত নয়। কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে কনস্টেবল জাকির জড়িত বলে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা শুনেছি ঘটনাটি। কনস্টেবল জাকির হঠাৎ করেই এক মাসের ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে যান। থানায় অভিযোগ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো হয়নি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম