হত্যার শিকার শুভর শেষবিদায় আটকে আছে ‘কাগজে’
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লাল। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শুভ ওরফে বিল্লালের এখনো শেষবিদায় হয়নি। তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাবা-মায়ের ‘টানাটানি’-তে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আদেশ দিয়েছেন যে, শুভর শেষবিদায় হবে ইসলামী রীতিতে। সেই আদেশের কপি এখনো পৌঁছেনি জেলা পুলিশের কাছে। এ কারণে লাশ দাফন করা হয়নি। ৭ দিন ধরে তার লাশ ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে ও পরে হিমঘরে রয়েছে।
গত বুধবার রাত থেকে তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে। তার শেষবিদায় নিয়ে পরিবার বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দাফন না সৎকার- এ জটিলতার বিষয়টি আদালতে গড়ায়। এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়।
রিটকারীর আইনজীবী জুয়েল আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর শুভ ওরফে বিল্লাল হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তার লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় বিল্লালের সনাতন ধর্মাবলম্বী বাবা হিন্দু রীতি অনুযায়ী ছেলের সৎকারের দাবি করেন। অন্যদিকে বিল্লালের মা, ভাই, বোন ও স্ত্রী জানান- তারা ২০০৩ সালে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তারা মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন করছেন। তাই বিল্লালের লাশ মুসলিম শরিয়াহ অনুযায়ী দাফনের আবেদন জানাই আমরা।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এসএম সাইফুল ইসলামের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, নিহত শুভর ভাই, স্ত্রী ও মা বলেছেন তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি দুই ভাই স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়েছেন। ধর্মীয় মতানুসারে মুসলিম মেয়ে অন্য কোনো ধর্মের লোককে বিয়ে করতে পারে না। যদি বিয়ে হয় তাহলে সেই বিয়ে ও সন্তানের পরিচয় নিয়ে সমাজে প্রশ্ন উঠবে। যেহেতু শুভর স্ত্রী ও ভাই দাবি করেছেন তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন- সেজন্য তাদের বিয়ে ও সন্তান বৈধ।
তিনি বলেন, প্রকাশ্য আদালতে শুভর ভাই সুরা ইখলাছ পাঠ করে শুনিয়েছেন। ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ না করলে এভাবে সুরা পাঠ করা সম্ভব নয় কারও পক্ষে। আদালত সবার বক্তব্য গ্রহণ করে শুভর মরদেহ ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী দাফন করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
রিট আবেদনে বলা হয়, ২০০৩ সালের ২৬ জুন নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা এফিডেভিটে জন্মগতভাবে সনাতন ধর্মের অনুসারী শুভ, তার মা পার্বতী রাণী দাস ও ভাই সজীব চন্দ্র দাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে শুভর নাম রাখা হয় বিল্লাল। তিনি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন।
পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল মান্নানের মেয়ে জ্যোতিকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে করেন বিল্লাল। তাদের দুই বছর বয়সি একটি সন্তানও রয়েছে। বিল্লালের মৃত্যুর পর তার লাশ দাফন নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে স্ত্রী জ্যোতি ইসলামী রীতিতে দাফনের জন্য প্রথমে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়ায় পরে হাইকোর্টে রিট মামলা করেন তিনি। আইনি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বিল্লালের লাশ পুলিশের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণে রাখা হয়।
রিটে আইন মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সদর থানার ওসিকে বিবাদী করা হয়। মুসলিম আইন ও সাংবিধানিক অধিকারের কথা উল্লেখ করে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বিল্লালের লাশ দাফনের নির্দেশনা চাওয়া হয়।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১টার দিকে মাদক ব্যবসার বিরোধের জের ধরে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামহলের সামনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তার মরদেহ, ৫টি গুলির খোসা, ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান বলেন, নিহতের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধের জেরে মরদেহটি ৫ দিন সুপার স্টার গ্রুপের মানবিক সেবায় ব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্সে ও ২ দিন ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। হাইকোর্টের আদেশের কপি এখনো আমরা পাইনি। পেলে লাশ দাফন করা হবে।
