দুই হাজার টাকা ঘুস নিয়ে কর্মকর্তা বললেন ‘আমার ওপর তো আপনি বেজার না’
Advertisement
শামীম শেখ, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এক সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে মাত্র ২ হাজার টাকা গ্রহণ করে ফেঁসে যাচ্ছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলম। তার ঘুস গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে শোকজ করেছে। তবে তিনি এখনো তার পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) তার ঘুস গ্রহণের ওই গোপন ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, নির্বাচন কর্মকর্তা তার চেয়ারে বসে একজন প্রবাসীর নতুন ভোটার আইডি করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ঘুসের টাকা গ্রহণ করছেন। এ সময় ওই কর্মকর্তাকে সেবাগ্রহীতার উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, ‘আমার ওপর তো আপনি বেজার না?’
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা ঝড় ওঠে। পরে রাসেল মোল্লা নামের ওই ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতা ফেসবুকে তার বক্তব্য তুলে ধরেন।
রাসেল মোল্লা বলেন, আমি বাহরাইন প্রবাসী। ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। পূর্বে আমার কোনো ভোটার আইডি ছিল না। আমি ২০১৩ সালে জন্মনিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশ গিয়েছিলাম। ঘটনার দিন গত বৃহস্পতিবার আমি নতুন ভোটার আইডি কার্ড করার জন্য উপজেলা নির্বাচন অফিসে যাই। নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলম আমার কাছে কাজ করে দেয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা ঘুস দাবি করেন। আমি উনাকে বহু কাকুতি মিনতি করে ২ হাজার টাকা দেই।
রাসেল মোল্লা আরও বলেন, আমি ব্রেন টিউমারে অসুস্থ ছিলাম। এ কথা নির্বাচন কর্মকর্তাকে বলার পরেও উনি নানা অজুহাতে আমাকে তিন-চার দিন তার অফিসে ঘুরাইছে। টাকা দেওয়ার পর তিনি আমার ভোটার আইডি কার্ড করে দেন।
এ সময় অভিযোগ করে বলেন, শুধু আমি নই। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি এই অফিসে টাকা ছাড়া কোনো সেবা পাওয়া যায় না। টাকা না দিলে অফিসের অন্যরাও দুর্ব্যবহার করেন। আমি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে এই অসৎ দুর্নীতিবাজ নির্বাচন কর্মকর্তার শাস্তি দাবি করছি।
এদিকে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের নানাবিধ অনিয়ম, অপকর্ম ও ঘুসবাণিজ্য নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ সময় ভুক্তভোগীরা নির্বাচন কর্মকর্তা বিচার দাবি করেন।
কেউ বলছেন, নির্বাচন অফিসে টাকা ছাড়া কোনো সেবা মিলে না। টাকা না দিলে নানা টালবাহানায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের লম্বা একটা তালিকা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়; যা বেশিরভাগ সেবাপ্রত্যাশীর পক্ষে ম্যানেজ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে বারবার অফিসে ঘুরেও তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। অথচ দালাল ধরে বা সরাসরি টাকা দিলে সহজেই সেবা মিলে।
অভিযোগ রয়েছে, এই দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় কয়েকটি কম্পিউটার দোকানদার। এদের হাতে টাকা দিলে তা মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে। ফলে নতুন ভোটার আইডি করে দেওয়া, আইডি কার্ডে নামের ভুল বানান সংশোধন করা, পিতা ও মাতার নাম সংশোধনসহ যাবতীয় কাজ খুব সহজেই হয়ে যায়। একেকটি কাজে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুস নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তা বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, আমি জরুরিভিত্তিতে বিদেশ যাওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ভোটার আইডি করেছি। এই অফিসের কেউ টাকা ছাড়া কোনো কাজ করে না।
এ বিষয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল হুদা বলেন, আমি নির্বাচন অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টা জানিয়েছি। তারা খবিরুল আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
রাজবাড়ী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সেক মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ঘুস নেওয়ার বিষয়টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেখার পর খবিরুল আলমকে ওই দিনই (গত বৃহস্পতিবার) শোকজ করেছি। আগামী তিন কার্য দিবস অর্থাৎ মঙ্গলবারের মধ্যে তাকে শোকজের জবাব দিতে বলেছি। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হলে এবং তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন অফিস কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। যেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
