সিনেমাকেও হার মানিয়েছে রায়হানের কাহিনী
Advertisement
নাজিম উদ্দীন রানা, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
শিশু রায়হান
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার ১২ বছরের শিশু রায়হান। তার জীবনে ঘটে যাওয়া কাহিনী সিনেমাকেও হার মানিয়েছে।
সৎমায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সাত মাস আগে চুল কাটার কথা বলে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল রায়হান। সাত মাস পর সেই ছেলেকে পাওয়া গেল ভিক্ষা করা অবস্থায়। তবে স্বাভাবিকভাবে নয়—ডান পা হারিয়ে। ঢাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের খপ্পরে পড়ে তার ডান পা কেটে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নয়াপাড়া এলাকার দিনমজুর নাজিম উদ্দিনের ছেলে মো. রায়হান।
১২ সেপ্টেম্বর (শনিবার) রাতে চুনতি সিরাত মাহফিলের সমাপনী দিনে সিরাত ময়দানে ভিক্ষা করার সময় এলাকার এক ব্যক্তি তাকে চিনতে পারেন। পরে খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন বাবা।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন জানান, প্রায় সাত মাস আগে চুল কাটার জন্য ছেলেকে ১শ টাকা দিয়ে বাড়ি থেকে পাঠিয়েছিলেন। ওই দিন একটি মিছিলের গাড়িতে করে চুনতি বাজারে যায় রায়হান। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিল সে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুনতি থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পর একটি চক্র তাকে ঢাকায় নিয়ে যায়। পরে রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় তার ডান পা কেটে দেওয়া হয়। এরপর তাকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হতো। তার মতো আরও কয়েকজন শিশুর পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয়েছে বলেও রায়হান জানিয়েছে। ভিক্ষা করে প্রতিদিন ৫শ টাকা চক্রের সদস্যদের দিতে হতো বলে দাবি তার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশুদের অপহরণ বা প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে পঙ্গু করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার মতো ভয়াবহ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্টেশন, বাস টার্মিনাল ও জনবহুল এলাকায় এসব চক্রের সদস্যরা শিশুদের নিয়ন্ত্রণে রাখে—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে রায়হানের বক্তব্যের সত্যতা ও তার পা কাটার ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
রায়হানের মা নেই। সৎমায়ের সঙ্গে চুনতির সাতগড় নয়াপাড়া এলাকায় তাদের বাড়ি হলেও তারা ইউনিয়নের সাতের আগা পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে। এক পা হারিয়ে এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শিশুটির ভবিষ্যৎ।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, ছেলেকে চুল কাটার জন্য ১শ টাকা দিয়ে বাড়ি থেকে পাঠিয়েছিলাম। সাত মাস পর তাকে ফিরে পেলাম, কিন্তু তার ডান পা নেই। সিরাত মাহফিলে ভিক্ষা করার সময় একজন পরিচিত মানুষ তাকে চিনে আমাকে খবর দেন। পরে ছেলের কাছ থেকে ঢাকার ওই চক্রের কথা জানতে পারি।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, বিষয়টি জানার পর রায়হানের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিকিৎসাসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
ঘটনার পেছনে পারিবারিক সহিংসতা রয়েছে কিনা এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে আলাপ চলছে। আশা করি শিগগিরই সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন করা যাবে।
এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে রায়হানের পরিবার। একই সঙ্গে রায়হানের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তায় সরকারি সহায়তারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
