সংসার নেই, সন্তান নেই, খোঁজ নেন না দুই ভাইও- সহযোগিতা চান বিলকিস
Advertisement
কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১২ পিএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একদিকে প্যারালাইসিসে অচল হয়ে আট বছর ধরে বিছানায় পড়ে থাকার অসহ্য যন্ত্রণা, অন্যদিকে মাথার ওপর ভাঙা চাল দিয়ে গড়িয়ে পড়া অঝোর বৃষ্টির পানি। শরীর নাড়ানোর ক্ষমতা নেই। ভিজে একাকার হয়ে রাত কাটানোই যেন তার নিত্যদিনের বাস্তবতা।
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার পাটারীরহাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মিয়ার বাড়ির এক চিলতে জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে দীর্ঘ আট বছর ধরে এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটাচ্ছেন অনাথ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত নারী বিলকিস বেগম (২৬)।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শৈশবেই বাবাকে হারান বিলকিস। কৈশোরে পা দিতেই হারান মাকেও। বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া ভিটায় একাকীত্বে কিছুদিন কাটানোর পর যখন বিয়ের বয়স, ঠিক তখনই ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে হঠাৎ স্ট্রোক করেন তিনি। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় কিছুটা চিকিৎসা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। এক হাত ও এক পা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে অচল হয়ে পড়েন তিনি। পরে অর্থের অভাবে চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ধীরে ধীরে তার পুরো শরীরই অক্ষম হয়ে পড়ে।
সংসার নেই, সন্তান নেই। এমনকি খোঁজ নেন না আপন দুই ভাইও। তারা অনেক আগেই বিয়ে করে অন্যত্র সংসারী হয়েছেন। বিলকিসের জীবনের একমাত্র ভরসা এখন প্রতিবেশীদের দয়া। কেউ এসে দুমুঠো খাবার দিলে আহার জোটে, নতুবা টানা দুই-তিন দিন অনাহারেই পড়ে থাকতে হয় তাকে।
তবে বর্ষা এলেই তার দুর্ভোগ চরমে ওঠে। জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরটি মেরামতের কেউ না থাকায় ভাঙা চাল দিয়ে অঝোরে পানি পড়ে পুরো ঘর ভেসে যায়। সম্প্রতি টানা বৃষ্টির মধ্যে রাতভর মুষলধারে পানি গায়ে পড়ে পুরো শরীর ভিজে একাকার হয়ে যায় দুখী এই নারীর। পরদিন প্রতিবেশী এক নারী এসে ভেজা কাঁথা রোদে শুকিয়ে দিলে তবেই সেটি আবার গায়ে জড়ানোর সুযোগ পান তিনি।
সম্প্রতি শরীরের ব্যথার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক বেলাল হোসেনের কাছে চিকিৎসার জন্য আকুতি জানান বিলকিস। অজানা এক ব্যক্তির দান করা মানতের একটি মোরগ বিক্রি করে ওষুধ কিনে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। এ দৃশ্য দেখে স্থানীয় কয়েকজনের হৃদয় নাড়া দেয়। পরে তারা বিলকিসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন।
প্রতিবেশীরা আক্ষেপ করে জানান, দীর্ঘ আট বছর তারা সাধ্যমতো বিলকিসের পাশে থাকলেও এখন আর তাদের পক্ষে তাকে সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিয়ের বয়সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় তার সংসার করা হয়নি। কোনো সন্তানও নেই, যিনি এই বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়াবেন। বর্তমানে একদিকে তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ, অন্যদিকে জরাজীর্ণ ঘর। সব মিলিয়ে জরুরি ভিত্তিতে সুচিকিৎসার পাশাপাশি ঘরটি মেরামত করা প্রয়োজন।
সরেজমিনে ওই ঝুপড়ি ঘরে কাঠের জরাজীর্ণ চৌকিতে শয্যাশায়ী বিলকিসের মুখোমুখি হলে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দুচোখের পানি ছেড়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে না-বলা জীবনের সব কষ্টের বোবা কান্না প্রকাশ করেন তিনি। তার এই অসহায়ত্ব দেখে উপস্থিত স্থানীয় লোকজন ও এ প্রতিবেদকের চোখেও অজান্তেই পানি চলে আসে।
অত্যন্ত করুণ ও মানবিক এই ঘটনায় জাতীয় সংসদের হুইপ ও লক্ষ্মীপুর-৪ (কমলনগর-রামগতি) আসনের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন অসহায় বিলকিস।
বিলকিসের প্রতিবেশীদের আকুল আবেদন, জীবনের শেষ দিনগুলোতে যেন অন্তত একটু সুচিকিৎসা পান তিনি। একই সঙ্গে মাথার ওপর যেন থাকে একটি শুকনো ছাদ, যেখানে এই অসহায় নারী অন্তত শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাসটুকু ত্যাগ করতে পারেন।
