ময়মনসিংহ মেডিকেলে উপচেপড়া ডেঙ্গু রোগী, একদিনে দুজনের মৃত্যু
Advertisement
ময়মনসিংহ ব্যুরো
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায়ও ডেঙ্গু রোগীর ভিড়
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রমান্বয়ে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ অন্যান্য জেলা থেকেও জ্বর ও ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে অসংখ্য রোগী ভর্তি হচ্ছেন।
ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীর চাপে একদিকে যেমন চিকিৎসকরা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, অন্যদিকে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্তে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মারা যাওয়া দুইজনের মধ্যে একজন ৫০ বছরের কুলসুমা। তিনি নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার গাছতলা এলাকার ইসহাক মিয়ার স্ত্রী। তাকে ১৬ সেপ্টেম্বর বিকালে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া অন্য রোগী ৩৫ বছরের আল আমিন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার নূরুল আমিনের ছেলে। তাকেও গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ১৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ হিসেবে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু লক্ষণ নিয়ে নতুন করে ৩৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৫ জন। চলতি মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরে এপর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ৩৮৪ জন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শয্যা না পেয়ে মেঝেতে, বারান্দায় এবং করিডোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শত শত রোগীকে।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল ছাড়াও পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক জটিল ও মুমূর্ষু রোগী এই হাসপাতালে আসেন। অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে গুরুতর রোগীদের দ্রুত এখানে রেফার করা হলেও অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রয়োজনীয় শয্যা ও চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। ওয়ার্ডগুলোতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা এবং সিঁড়ির নিচে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীর ভিড়ে চিকিৎসাকর্মীরা দিনরাত সেবা দিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না।
রোগী ও স্বজনরা জানান, রোগীর স্থান সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালের পরিবেশ। মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে থাকা রোগীদের ঠিক পাশেই দেখা যাচ্ছে ময়লা-আবর্জনা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা, ক্যানুলা, খাবারের উচ্ছিষ্ট এবং ঠিকমতো পরিষ্কার না করা ড্রেন ও টয়লেটের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ওয়ার্ডজুড়ে। একটি মশারি টাঙানোর পর্যাপ্ত জায়গা পর্যন্ত অনেক রোগী পাচ্ছেন না। এমন নোংরা পরিবেশে চিকিৎসা নিতে এসে ভালো হওয়ার বদলে উল্টো অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। পর্যাপ্ত নার্স ও চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের জরুরি সেবায় বিলম্ব ঘটছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী ফোকাল পারসন ডা. মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জানান, রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই ওয়ার্ডে মাত্র ২৪টি শয্যা। এই ২৪টি শয্যার মধ্যে একশ থেকে ১৫০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই স্থান সংকুলান হচ্ছে না। রোগীদের বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা দিতে আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই হাসপাতাল ভর্তি হওয়ার দরকার নেই। এই ওয়ার্ডে অনেক রোগী আছেন যাদের ভর্তি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই কিন্তু তারাও ভর্তি হচ্ছেন। শুধু এমন রোগী ভর্তি হবে-যাদের ডায়রিয়া হয়েছে, বমি হচ্ছে, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ আছে। লিভার, কিডনির সমস্যা যাদের আছে এবং অনেক বয়স্ক বা ছোট বাচ্চা- এই সব রোগীদের ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন আছে।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী যেহেতু বেড়ে যাচ্ছে, সেজন্য হাসপাতালের তিনতলায় একটা এনেক্স ওয়ার্ড আছে। এই ওয়ার্ডটি তুলনামূলক বড়। সেখানেই ডেঙ্গু রোগীদের স্থানান্তর করা হবে ।
ডেঙ্গু রোগের ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে সর্তক করে তিনি বলেন, বাড়ির আশপাশে যেন পরিষ্কার করে রাখি, ভাবের খোসার ভিতরে পানি এবং ড্রেনের পানি যেন আটকে না থাকে। রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করি।
