Logo
Logo
×
   

Advertisement

সারাদেশ

বাসের ধাক্কায় বাবার মৃত্যুতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৩ পিএম

বাসের ধাক্কায় বাবার মৃত্যুতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

নিহত মীর জালাল আহমেদ। ফাইল ছবি

Advertisement

রাজধানীর উত্তরার তুরাগ থানাধীন ধউর এলাকার কালু মিয়া বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিনের মতোই বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন মীর জালাল আহমেদ (৫০)। কিন্তু সেদিন আর ঘরে ফেরা হয়নি তার। ঢাকা-সিলেটগামী এনা পরিবহণের একটি বাসের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।

জালালের আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু একটি প্রাণই ঝরে যায়নি, অনিশ্চয়তায় পড়েছে একটি পুরো পরিবার। স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে এখন কীভাবে সংসার চালাবেন, কীভাবে তাদের পড়াশোনা শেষ করবেন—জানেন না স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম (৪২)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ ও সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছেন নিহতের পরিবার।

পরিবারের সদস্যরা জানান, নিহত জালাল গার্মেন্টসে ছোট একটি চাকরি করে অতি কষ্টে সংসার চালাতেন। ধউরের ভাড়া বাসায় স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সংসার। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছেন তিনি।

পরিবারের ভাষ্য, দুর্ঘটনার সময় ধউরের কালু মিয়া বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন জালাল। এ সময় ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-০৩১০ নম্বরের এনা পরিবহনের বাসটি বেপরোয়া গতিতে এসে তাঁকে ধাক্কা দেয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।

গুরুতর আহত জালালকে ইস্ট ওয়েস্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্ত শেষে ধউর এলাকায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। ঘটনার পর বাসটি তুরাগ থানায় রয়েছে এবং এ ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

তবে স্বজনদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর এখন পর্যন্ত এনা পরিবহণের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পরিবহণ কর্তৃপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি বলে দাবি তাদের।

জালালের বড় ছেলে আনিসুর রহমানের বয়স ২৬ বছর। অনার্স শেষবর্ষের এই শিক্ষার্থী IELTS পরীক্ষায় ৭.৫ স্কোর করেছিলেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে একটি এজেন্সির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় যান তিনি।

পরিবারের দাবি, আনিসুরকে ফুল স্কলারশিপ দেওয়ার কথা বলা হলেও দেশটিতে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর তিনি জানতে পারেন, কথিত ওই স্কলারশিপের মেয়াদ ছিল মাত্র ছয় মাস। এরপর প্রায় দুই বছর নিজের খরচে থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয় তাঁকে।

ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বাবা জালাল ঋণ করে অর্থ পাঠিয়েছেন বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত আর্থিক সংকটের কাছে হার মেনে গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করেই দেশে ফিরতে বাধ্য হন আনিসুর। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন।

পরিবারের দাবি, ছেলের বিদেশে পড়াশোনার খরচসহ বিভিন্ন কারণে এরই মধ্যে তাঁদের প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। এর মধ্যে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সেই সংকট আরও গভীর হয়েছে।

জালালের মেয়ে তাবাস্সুম আক্তার জিনিয়ার বয়স ১৭ বছর। সে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ভাইয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে যে পরিবারটি এরই মধ্যে বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা বহন করছে, বাবার মৃত্যুর পর জিনিয়ার পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

জালালের স্ত্রী নুরুন্নাহার একজন গৃহিণী। স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারে এখন নিয়মিত আয়ের কোনো নিশ্চিত উৎস নেই। ফলে সংসারের খরচ, ঋণ পরিশোধ এবং দুই সন্তানের পড়াশোনা—সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

সরকারের কাছে পরিবারের আকুতি

পরিবারটির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহায়তা চেয়েছেন স্বজনরা। তাদের দাবি, দুর্ঘটনাটি যথাযথভাবে তদন্ত করে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী পরিবারটির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক।

একই সঙ্গে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু এবং দুই সন্তানের শিক্ষাজীবনের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

স্বজনদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেবেন।

একটি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু হয়তো পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু জালাল আহমেদের পরিবারের কাছে এটি শুধু একজন স্বজনকে হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার গল্প।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম