Logo
Logo
×
   

Advertisement

সারাদেশ

৩০ দিনে ৫৫২ কোটি টাকার ঘুস, ১৯ সহস্রাধিক অভিযোগ

Advertisement

Icon

অমিত রায়, ময়মনসিংহ ব্যুরো

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম

৩০ দিনে ৫৫২ কোটি টাকার ঘুস, ১৯ সহস্রাধিক অভিযোগ

ঘুস-সাইট

Advertisement

মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা উত্তোলন ও পাসপোর্ট করতে গিয়ে পদে পদে হয়রানি ও ঘুস চাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি ময়মনসিংহের কিশোর শাহেদ শরিফ আহমেদের ‘ঘুস.সাইট’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে ময়মনসিংহ তথা সারা দেশে।

এই ‘ঘুস.সাইট’-এ গত এক মাসে জমা পড়া ১৯ হাজার রিপোর্ট থেকে প্রায় ৫৫২ কোটি টাকার ঘুসের অভিযোগ উঠেছে। এসব রিপোর্টের মধ্যে ভূমি অফিস ও পাসপোর্ট অফিস ঘুসের সূচকে শীর্ষে রয়েছে।

ঘুস.সাইট-এর তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় প্রতিনিয়ত হুমকি পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে নিজ উদ্যোগে পরিচালিত এ সাইটটি নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন তারা।

উল্লেখ্য, ‘ঘুস.সাইট’-এ জমা পড়া অভিযোগকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাবি করছেন না উদ্যোক্তারা।

তাদের ভাষ্য, ওয়েবসাইটটি কোনো তদন্ত সংস্থা নয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্পও নয়। সাইটে প্রকাশিত অভিযোগগুলোকে ‘আনভেরিফায়েড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

উদ্যোক্তারা জানান, উদ্যোগটি চালু থাকলে ঘুস-দুর্নীতি কমাতে ভূমিকা রাখবে। তবে তা অনেকাংশে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে। ফলে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন তারা।

 

যে কারণে তৈরি হয় ‘ঘুস.সাইট’

ময়মনসিংহ নগরীর সানকিপাড়া এলাকার বাসিন্দা শাহেদ শরীফ আহমেদ। ১৮ বছরের শাহেদ ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালে এ-লেভেলে পড়াশোনার পাশাপাশি শিখছেন ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের কাজ। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শাহেদের মা আমিনা খাতুন অসুস্থতাজনিত কারণে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মৃত্যুর পর তার পেনশন ও অন্যান্য ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে সরকারি দপ্তরে পদে পদে হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হন। পাশাপাশি ঘুস দিতে হয়।

এছাড়াও বছর দেড়েক আগে নিজের পাসপোর্ট করাতে গিয়েও ঘুস দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয় শাহেদ শরীফ আহমেদের। সেই থেকেই ভারতের একটি ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘ঘুস.সাইট’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরির উদ্যোগী হন। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাইফ কবীরের সহযোগিতায় চলতি বছরের ২১ আগস্ট চালু করেন সাইটটি।

শাহেদ বলেন, মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা তুলতে যাই। তখন আমাদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দুই লাখ টাকা ঘুস দাবি করেছিলেন। আমার বাবা ঘুস দিতে রাজি না হওয়ায় সেই টাকা তুলতে পারিনি আমরা। এছাড়া নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও তাকে দুই হাজার টাকা ঘুস দিতে হয়।

তিনি জানান, এসব অভিজ্ঞতা থেকে বন্ধু সাইফ কবীরের সহযোগিতায় ‘ঘুস.সাইট’ তৈরির উদ্যোগ নেন তারা।

শাহেদ শরীফ আহমেদ জানান, দেশের প্রতিটি অফিসে কাজ করতে গেলে ঘুস ছাড়া কিছুই হয় না- এমন একটি ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এই ঘুস-দুর্নীতির চিত্রটি সামনে আনতেই আমরা উদ্যোগটি নিয়েছি। চালুর পরপরই এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক অভিযোগ জমা হতে থাকে। চালুর প্রথম ১০ দিনে ১০ হাজারের বেশি রিপোর্টে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ঘুস হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ ৩৩০ কোটি টাকার বেশি এবং রোববার পর্যন্ত ৩০ দিনে ঘুস চাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৫২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

সাইফ কবীর জানান, সময় যত যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত অভিযোগ বাড়ছে।

যেভাবে কাজ করে ‘ঘুস.সাইট’

ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে দফতরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুস হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল- এ ধরনের তথ্য দিতে হয়। পাশাপাশি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। অভিযোগ দিতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই। সাইটটিতে কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করার সুযোগ রাখা হয়নি।

উদ্যোক্তাদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। সরকারি দপ্তরের সেবা পেতে ঘুসের চিত্র তুলে ধরাই তাদের লক্ষ্য। অভিযোগ বা রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর তা সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা নীতিমালা লঙ্ঘন করে- এমন অভিযোগ বাদ দেওয়া হয়। তাদের লক্ষ্য, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কর্মকর্তাদের গড়িমসি ও নাগরিকদের কাছে ঘুস চাওয়ার অভিজ্ঞতাগুলো নথিভুক্ত করে একটি উন্মুক্ত তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করা।

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ‘ঘুস.সাইট’ এখন পর্যন্ত নিজেদের অর্থেই পরিচালিত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি কোনো এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। তবে ঘুস.সাইট-এর জন্য স্বেচ্ছায় অনুদানের সুযোগ রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, শুধু অভিযোগের তথ্য সংরক্ষণ করাই তাদের শেষ লক্ষ্য নয়। সরকারি সহযোগিতা পেলে এসব তথ্যের ভিত্তিতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ হতে পারে।

সরকারের সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে শাহেদ শরীফ আহমেদ জানান, দীর্ঘমেয়াদে উদ্যোগটি চালু রাখতে পারলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঘুস-দুর্নীতি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

‘ঘুস.সাইট’-এ অভিযোগ মানেই প্রমাণ নয়

‘ঘুস.সাইট’-এ জমা পড়া রিপোর্ট বা অভিযোগগুলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাবি করছেন না উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, ওয়েবসাইটটি কোনো তদন্ত সংস্থা বা দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প নয়। সাইটে প্রকাশিত অভিযোগগুলোকে ‘আনভেরিফায়েড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঘুস.সাইট-এ আগত অভিযোগ যাচাই-বাছাই ও মডারেশনের পর প্রকাশ করা হয়। 

এদিকে ঘুস.সাইট-এর খবর প্রকাশের পর খুব দ্রুত কাজ শুরু করেছে শিক্ষা অফিস। আগের তৈরি নথিপত্র পরিবর্তন করে নতুন নথি প্রস্তুতের কাজ করা হচ্ছে। আশা করছি দ্রুত আমাদের পাওনা পেয়ে যাব। এ ঘটনায় ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের দুই কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে বদলি করা হয়েছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম