অশ্রুসিক্ত নয়নে চিরবিদায়
ভাত খাওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা
Advertisement
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সহপাঠীদের ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জের ধরে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থানাধীন বড় শলুয়া গ্রামের মেধাবী খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আজমল হক আজমকে মারধর ও নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। বাবা ও স্বজনরা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে চিরবিদায় জানান।
এদিকে হত্যার ঘটনায় রোববার সকালে খুলনার হরিণটানা থানায় নিহতের বাবা ২০-২৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন।
আজমল হক আজম (২২) দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থানাধীন বড় শলুয়া গ্রামের কৃষক কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি খুলনার নর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন।
আজমল হকের পিতা কুতুব উদ্দিনের দাবি, তার ছেলেকে বাঁচাতে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল।
উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় কৃষক পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ সেপ্টেম্বর আজমল খুলনার নর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি ছাত্র মেসে সহপাঠীদের সঙ্গে থাকতেন। পরে নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য হলে তিনি মেসের ডি-৮ নম্বর কক্ষে চলে যান।
অভিযোগ রয়েছে, শুক্রবার রাতে সহপাঠীদের ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাকে বহিরাগত বলে মারধর ও বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের ভাষ্যে অভিযোগ উঠে।
নিহতের বাবা কুতুব উদ্দিন শনিবার গভীর রাতে ছেলের দাফন শেষে বাড়ির সামনে সাংবাদিকদের বলেন, তার ছেলে খুলনায় ভর্তি হওয়ার পাঁচ দিন পর বাড়িতে এসেছিল। পরে গত শুক্রবার আবার খুলনায় ফিরে যায়। ওই রাত ৯টার দিকে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। ছেলে বলে আব্বু আমি চলে এসেছি। আমাকে নিয়ে কোনো চিন্তা করো না। এরপর রাত ১২টার পর তার ছেলের ফোন থেকে একজন তাকে জানায়, আপনার ছেলে আজমল সমস্যায় পড়েছে। সমাধান করতে এক লাখ টাকা লাগবে। টাকা না দিলে আপনার ছেলে পাবেন না।
তিনি বলেন, তখন তিনি নিজেকে গরিব কৃষক উল্লেখ করে এক লাখ টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই বলে জানান। এ সময় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তাকে দ্রুত ট্রেনে করে খুলনায় চলে আসতে বলা হয়।
নিহতের বাবা আরও বলেন, রাতের ট্রেনে রওনা হয়ে শনিবার সকাল ৬টার দিকে মেসে পৌঁছে দেখেন মেসে তালা দেওয়া। সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে স্থানীয় এক দোকানদারের কাছে জানতে পারেন, রাতে মেসে ঝামেলা হয়েছে এবং এক শিক্ষার্থীকে মারধরের পর হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়েছে।
পরে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লাশ দেখতে পান কুতুব উদ্দিন। তার দাবি, আজমলের হাত-পা, শরীর, মাথা ও পিঠসহ বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল।
শনিবার ময়নাতদন্ত শেষে রাত ১১টার দিকে আজমলের লাশ চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামে পৌঁছায়। এ সময় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারি ও কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ। রাত ১২টার দিকে স্থানীয় কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এ বিষয়ে খুলনার হরিণটানা থানার ওসি ইকবাল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিহতের বাবা বাদী হয়ে মেসের চারজনের নাম উল্লেখসহ ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আসামি ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আসামিদের ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।
খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কানাই লাল সরকার বলেন, আজমল হোসেন ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে বলে শুনেছি।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি শুনে আমি হতবাক হয়ে পড়েছি। খুবই দুঃখজনক ঘটনা। তাদের যদি অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকত তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারত। তাই বলে একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে- এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমার ছেলে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, আমার ছেলের সঙ্গে যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে আমার কী হতো। আমি মানসিকভাবে খুব কষ্টের মধ্যে আছি। তবে আজমলের বাবার পাশে আমরা আছি। আইনি সহযোগিতা করব। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সোমবার সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
