Logo
Logo
×
   

Advertisement

সারাদেশ

এক শিক্ষার্থীর ১৯ শিক্ষক-কর্মচারী

Advertisement

Icon

হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

এক শিক্ষার্থীর ১৯ শিক্ষক-কর্মচারী

বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসা

Advertisement

সারি সারি বেঞ্চ। অথচ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী মাত্র একজন। হাতে বই নিয়ে একা বসে আছে অষ্টম শ্রেণির বৃষ্টি আক্তার। অপেক্ষা করছে শিক্ষকের জন্য; কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও শ্রেণিকক্ষে এলেন না কোনো শিক্ষক।

অন্যদিকে পাশের কক্ষে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীকে গল্প-আড্ডায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল। কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। অন্য একটি কক্ষে এক শিক্ষিকা নিজের শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে রেখেছেন। পাশে থাকা অন্য শিক্ষিকারা ব্যস্ত পারিবারিক আলাপচারিতায়।

একজন শিক্ষার্থীর সামনে খালি বেঞ্চের সারি, আর তাকে ঘিরে রয়েছে ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী- সরেজমিন এমনই চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ মৌজার হাসারপাড় বড়বাড়ি গ্রামের বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসায়।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে মাদ্রাসাটিতে গিয়ে দেখা যায়, নথিতে শিক্ষার্থী ১৮৮ জন। শিক্ষক-কর্মচারী ১৯ জন। এর মধ্যে শিক্ষক ১৪ জন এবং কর্মচারী পাঁচজন। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা বাবদ দেওয়া হচ্ছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৪ টাকা। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল একজন।

মাদ্রাসার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। পঞ্চম শ্রেণিতে ২২, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২৪, সপ্তম শ্রেণিতে ২৭, অষ্টম শ্রেণিতে ৩৪, নবম শ্রেণিতে ৪১ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সব মিলিয়ে নথিতে শিক্ষার্থী ১৮৮ জন।

অথচ সরেজমিন অষ্টম শ্রেণির কক্ষে বই নিয়ে বসে থাকা বৃষ্টি আক্তার ছাড়া অন্য শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষার্থী উপস্থিতি দেখা যায়নি।

বৃষ্টি আক্তার বলে- আমরা মাদ্রাসায় প্রতি দিন পাঁচ-ছয়জন করে আসি। ক্লাশ বেশি হয় না। তাই শিক্ষার্থীও আসে না।

তার এ বক্তব্যে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।

মাদ্রাসাটিতে শিক্ষক ১৪ জন ও কর্মচারী পাঁচজন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির জনবল ১৯ জন।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আরও শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএতে শূন্যপদের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তিও পায়।

প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১ জানুয়ারি ১৯৮৬ সালে স্বীকৃতি পায়।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের এমন অনুপস্থিতি কেন-তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

শিক্ষার্থী উপস্থিতির পাশাপাশি সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চলতি বছরের দাখিল/এসএসসি সমমান পরীক্ষায় মাদ্রাসাটি থেকে ৩১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। পাশ করেছে মাত্র দুজন।

স্থানীয় বাসিন্দা নুর ইসলাম অভিযোগ করেন, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানো হলেও দাখিল পরীক্ষার সময় হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে লোক এনে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। তাদের অটোভাড়া, খাবার ও পকেট খরচ দেওয়া হয়।

সাবেক শিক্ষার্থী সাগর ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার দাবি, মাদ্রাসা থেকে পাশ করার পর তাকে অন্যের হয়ে তিনবার প্রক্সি পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এজন্য তাকে অটোভাড়া ও পকেট খরচ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

মাদ্রাসার সহকারী সুপার আব্দুস সুবহান বলেন, মাদ্রাসাটি তিস্তা নদীর পাশে এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।

সুপার শাহালম বলেন, আশপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় আসে না। হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে যারা ভর্তি হয়, তাদের অনেকেই গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল।

মাদ্রাসার শিক্ষক সামছুল হক বলেন, মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী এমনিতেই কম। সেটা সবাই জানে।

মাদ্রাসার সভাপতি ও কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) মো. লাল মিঞা সরকার বলেন, তিনি শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি অবগত।

তিনি বলেন, নদী এলাকা ও হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। আগামীতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে মাদ্রাসামুখী করার জন্য কাজ করার প্রস্তুতি চলছে।

রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, দুই-একদিনের মধ্যে পরিদর্শন করব। সমস্যা পাওয়া গেলে অবশ্যই রিপোর্ট করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম