Logo
Logo
×
   

Advertisement

সারাদেশ

ড্রামের ভেলায় স্বপ্ন পাড়ি

Advertisement

Icon

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা)

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২১ পিএম

ড্রামের ভেলায় স্বপ্ন পাড়ি

ড্রামের ভেলায় স্বপ্ন পাড়ি

Advertisement

কারো হাতে বইয়ের ব্যাগ, কেউ আবার কাঁধে নিয়েছে স্কুলের পোশাক। চোখে তাদের স্বপ্ন- পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া; কিন্তু বিদ্যালয়ে পৌঁছতে প্রতিদিন তাদের পাড়ি দিতে হয় ভয় আর শঙ্কায় ভরা এক পথ। পাকা রাস্তা কিংবা সেতু নয়, ড্রামের তৈরি ভেলাই তাদের একমাত্র ভরসা।

খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন শাকবাড়িয়া বদ্ধ নদীর তীরে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় ভেঙে যাওয়া বাঁধটি ১৭ বছরেও নির্মাণ হয়নি। প্রায় ১৭০ মিটার দীর্ঘ ভাঙা অংশটি এখন যেন ছোট একটি নদীতে পরিণত হয়েছে। আর এই পানিপথ পেরিয়েই প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এমন দুর্দশা দেড় যুগ চললেও নেওয়া হয়নি কোনো বাস্তব পদক্ষেপ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ভাঙা বাঁধের এক পাশে রয়েছে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। অন্যপাশ থেকে বিদ্যালয়ের দিকে যেতে হলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের ড্রামের তৈরি ভেলায় উঠতে হয়। ভেলা যাতে স্রোতে ভেসে না যায়, তার জন্য দুই পাশে বাঁধা রশি ধরে টেনে টেনে পার হতে হয়। সামান্য অসতর্কতা কিংবা ভারসাম্য হারালেই পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভেলায় উঠলেই বুক কাঁপে

প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন আহমেদ বলে- প্রতিদিন ড্রামের ভেলায় চড়ে স্কুলে যেতে হয়। ভেলায় উঠলেই ভয় লাগে কখন যে উল্টে যাই। তারপরও পড়াশোনার জন্য প্রতিদিন এই ঝুঁকি নিতে হয়। আমরা চাই এখানে দ্রুত একটি রাস্তা নির্মাণ করা হোক।

পূর্ব মঠবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলেন, ড্রামে চড়ে ওপারে স্কুলে যেতে খুব ভয় লাগে। একবার ভেলা উল্টে নদীতে পড়ে গিয়েছিলাম। বইয়ের ব্যাগসহ সবকিছু পানিতে ভিজে যায়। পাশে মানুষ থাকায় কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছি। আমরা চাই এখানে একটা রাস্তা হোক, যাতে নিরাপদে স্কুলে যেতে পারি। 

সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েও দুশ্চিন্তায় মা-বাবা

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে প্রতিদিন উদ্বেগে থাকেন অভিভাবকরাও। প্রতাপ স্মরণী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক হোসনেয়ারা খাতুন বলেন, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর পর খুব চিন্তায় থাকতে হয়। একবার ভেলায় পার হওয়ার সময় আমার মেয়েসহ কয়েকজন শিশু পানিতে পড়ে গিয়েছিল। কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছে। আমরা চাই দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণ করা হোক।

তার মতে, রাস্তা নির্মাণ করা না হলেও স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ড্রাম সেতু নির্মাণ করা হোক।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আছাদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্কদের তখন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এখানে একটি স্থায়ী বাঁধ ও নিরাপদ সড়ক নির্মাণ করা হলে শুধু দুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগই কমবে না, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ হবে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে

প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রণজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, ২০০৯ সালে আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এখানে বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়ত বাচ্চাদের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় পার হতে হয়। অনেক অভিভাবক যাতায়াতের সমস্যার কারণে সন্তানদের এই স্কুলে ভর্তি করাতে চান না। আমরা দ্রুত শাকবাড়িয়া বদ্ধ নদীর বাঁধ নির্মাণের দাবি জানাই।

মহারাজপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু সাঈদ মোল্লা বলেন, ১৭০ মিটারের বেশি এই ভাঙা অংশ ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য বরাদ্দ দিয়ে সংস্কার করা সম্ভব নয়। জায়গাটি গভীর এবং বড় আকারের। একটি ভাসমান সেতু কিংবা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা গেলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন বাঁধটি পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বরাদ্দের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছি। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ নির্মাণ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশেষ করে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে ড্রামের ভেলায় ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম