মুক্তিপণ দেওয়ার পরও শিশুকে ছাড়েনি অপহরণকারীরা, পুলিশের অসহযোগিতার অভিযোগ
Advertisement
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অপহরণকারীদের মুক্তিপণের ১০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও ১১ বছরের মো. জিসানকে ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। উলটো আরও ৬০ হাজার, পরে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
গত ২১ সেপ্টেম্বর আসরের নামাজের পর বংশালের সাতরওজা খাজে নেহাল জামে মসজিদের মাদ্রাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ হয় জিসান, চার দিনেও তার সন্ধান মেলেনি। একমাত্র সন্তানকে ফিরে পেতে বাবা মো. সাজু মিয়া বিভিন্ন জায়গায় ছুটছেন। এর মধ্যে বংশাল থানার কাছ থেকে সহযোগিতা পেলেও গাজীপুরের শ্রীপুর থানায় গিয়ে অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে শ্রীপুর থানার ওসি বলেছেন, রাত ৮টার পরপরই পুলিশ তাদের নিয়ে বিকাশের দোকানে গেছে।
পরিবার ও জিডি সূত্রে জানা যায়, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানাধীন ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল হাসনাত রোডের সাতরওজা এলাকা থেকে জিসান নিখোঁজ হয়। আসরের নামাজের পর সে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে আশপাশে অবস্থান করছিল। তার পরনে ছিল লাল পাঞ্জাবি-পায়জামা এবং মাথায় সাদা-কালো কাজ করা টুপি। মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বের হওয়ার প্রায় এক মিনিট পর সে আবার মাদ্রাসার ভেতরে ঢোকে। প্রায় ২০ মিনিট পর আবার বের হয়ে যায়। এরপর আর মাদ্রাসায় ফেরেনি।
জিসানের বাবা মো. সাজু মিয়া গাজীপুরের মাওনায় একটি টেক্সটাইল মিলে চাকরি করেন। ছেলেকে কোরআনের হাফেজ বানানোর উদ্দেশ্যে ঢাকায় তার মামার কাছে রেখেছিলেন। জিসানের মামা ওই মাদ্রাসার শিক্ষক। সাজু মিয়া জানান, ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর মাদ্রাসার হুজুরের সঙ্গে কথা বলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হয়। এরপর বংশাল ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত দেখা হয়। মসজিদের সামনের ফুটেজে জিসানকে বের হতে দেখা গেলেও এরপর কোন দিকে গেছে, তার আর কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
২২ সেপ্টেম্বর সকালে বংশাল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সাজু মিয়া। পরে রাতে পুলিশ এসে পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নেয় এবং মাদ্রাসার ছাত্রদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে।
সাজুর ভাষ্য, পরে তিনি জানতে পারেন, মাদ্রাসার কোনো এক ছাত্র জিসানের মোবাইল ফোন ও ২০০-৩০০ টাকা লুকিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। জিসানের মামা ওই ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলে সে মোবাইল নেওয়ার কথা অস্বীকার করে। পরে তার বিছানার বালিশের নিচে মোবাইলটি পাওয়া যায় এবং মালিককে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সাজুর ধারণা, মোবাইল নেওয়ার অভিযোগে মামার ভয়ে জিসান আসরের পর মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে আর ভেতরে ফেরেনি।
জিডি করার দুই দিন পর ফেসবুকে জিসানের ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার পর ইমোতে ফোন আসে। ফোনকারী দাবি করে, জিসানকে অপহরণ করা হয়েছে এবং ৫০ হাজার টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। দেনদরবারের পর পরিবার ১০ হাজার টাকা দিতে রাজি হয়। টাকা দেওয়ার আগে ছেলেকে দেখাতে ও তার সঙ্গে কথা বলাতে বললে ফোনকারী দুই-তিন সেকেন্ডের একটি ভিডিও দেখায়। তবে ওই ভিডিওতে জিসানকে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়নি। ইমোতে ফোন আসায় ফোনকারীর স্বাভাবিক মোবাইল নম্বরও পাওয়া যায়নি।
পরে বিকাশে ১০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। টাকা দেওয়ার পর বলা হয়, ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে জিসানকে বাসার দরজায় পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা পর আবার ফোন করে আরও ৬০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার মধ্যে ওই টাকা দিতে বলা হয়। পরে দাবির পরিমাণ কমিয়ে ৪০ হাজার টাকা করা হয়।
সাজু মিয়া বলেন, ১০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। আবার এত টাকা কোথা থেকে দেবেন—এ নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি সামনাসামনি দেখা করে টাকা নেওয়ার পাশাপাশি ছেলেকেও সঙ্গে দিতে বলেন। কিন্তু সারারাত ইমোতে মেসেজ দিলেও কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি, শুধু একটি বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বলা হয়, ‘তোর কোন বাপ আছে, তাকে নিয়ে তোর ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যা।’
ওই বিকাশ নম্বরটি পুলিশকে দিলে গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি বিকাশের দোকানের ঠিকানা পাওয়া যায়। এরপর বংশাল থানা পুলিশ পরিবারকে শ্রীপুরে যেতে বলে। সাজু মিয়ার অভিযোগ, শ্রীপুর থানায় গিয়ে তারা সহযোগিতা পাননি। তার অভিযোগ, শ্রীপুর থানার ওসি, তখনকার মহিলা ডিউটি অফিসার ও অন্য কর্মচারীরা তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত থানায় বসিয়ে রাখা হয়। পরে ওসি থানার পাশের কোয়ার্টারে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করে বিশ্রাম নিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বের হন এবং তাদের সঙ্গে বিকাশের দোকানে যেতে আরও সময় নেন। এ সময় তারা অটোরিকশায় পুলিশের গাড়ির পেছনে পেছনে ছুটে যান বলে অভিযোগ করেন সাজু।
পরে শ্রীপুর থানার ওসি কোয়ার্টার থেকে পোশাক পরিবর্তন করে বের হয়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের ওই বিকাশের দোকানে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক দারোগা দোকানের পাশের একটি বাসায় ঢুকে গেট বন্ধ করে দেন এবং সাজুকে বাইরে থাকতে বলেন। দীর্ঘ সময় কথা বলার পর শ্রীপুরের পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পাওয়া তথ্য বংশাল থানার জিডির দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআইকে দেওয়া হবে।
কান্নায় ভেঙে পড়ে সাজু মিয়া বলেন, তিনি মাওনা চৌরাস্তায় একটি টেক্সটাইল মিলে চাকরি করেন। ছেলেকে কোরআনের হাফেজ বানানোর জন্য ঢাকায় মামার কাছে দিয়েছিলেন। তার ভাষায়, আজ এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের পরিবারের সুখ-শান্তির ওপর বিশাল দুঃখের পাহাড় নেমে এসেছে।
জিডিতে জিসানের বয়স ১১ বছর। তার বাবার নাম মো. সাজু মিয়া এবং মায়ের নাম মিনু। তাদের ঠিকানা চর মাদারীপাড়া, গ্রাম মাদারীপাড়া হরিপুর, ইউনিয়ন/ওয়ার্ড হরিপুর, থানা সুন্দরগঞ্জ, জেলা গাইবান্ধা। জিসান পুরুষ ও অবিবাহিত। জিডির তথ্য অনুযায়ী, সে মানসিকভাবে অসুস্থ নয়। তার গায়ের রং শ্যামলা, উচ্চতা ৪ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ২৭ কেজি।
বংশাল থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রাশেদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বংশালের সিসিটিভি ফুটেজে জিসানকে শুধু এলাকা থেকে বের হতে দেখা গেছে। সে ১ সেপ্টেম্বর থেকে খাজে নেহাল জামে মসজিদ এলাকায় বোর্ডিংয়ে থেকে পড়াশোনা করছিল। নিখোঁজের দিন মাদ্রাসায় মোবাইল ও টাকা নেওয়া নিয়ে একটি ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ভীত হয়ে সে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যেতে পারে বলে তদন্তে ধারণা পাওয়া গেছে।
এসআই রাশেদুল ইসলাম আরও বলেন, পরিবারের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত সিমটি ঝর্ণা রানী নামে এক নারীর ভোটার আইডি দিয়ে নিবন্ধিত। বিকাশ অ্যাকাউন্টটি মোছাম্মৎ রাবেয়া নামে এক নারীর নামে ব্যবহার করা হয়েছে। শ্রীপুর থানার সহযোগিতায় জানা গেছে, বিকাশ নম্বরের ঠিকানা হিসেবে ব্যবহৃত দোকান ও আশপাশে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। বিকাশ নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ। পরিবারের কাছ থেকে নেওয়ার কথা বলা ১০ হাজার টাকাও ক্যাশ আউট করা হয়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
শ্রীপুর থানায় পরিবারের অসহযোগিতার অভিযোগের বিষয়ে এসআই রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘ভুক্তভোগীর কাছ থেকে শুনেছি, তারা বিকাল ৫টা থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য সেখানে অপেক্ষা করেছেন। রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর সেখানকার কর্তব্যরত কর্মকর্তারা গিয়েছেন—এমন অভিযোগ তারা করেছেন।’
তবে পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে শ্রীপুর থানার ওসি মো. শাহিনুর আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি বংশাল থানার ওসির সঙ্গে সমন্বয় করে সেখানে টিম পাঠিয়েছি। আপনি এখন বংশাল থানাকে জিজ্ঞেস করেন, তদন্ত করে কী পেয়েছে।
থানায় কর্তব্যরত মহিলা ডিউটি অফিসারের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগের বিষয়ে ওসি শাহিনুর আলম বলেন, হয়ত বুঝতে পারেনি। কেউ তো ইন্ট্রোডিউস করায় দেয় নাই তার সঙ্গে। আর আমি জানার পর ব্যবস্থা নিয়েছি।
বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কোনো সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘যখন তারা এসেছিল তখন বিকাল পার্টি ছিল। তাদের রাত ৮টায় ডিউটি চেঞ্জ হওয়ার পর রাতের পার্টি আসার পর তাদেরকে পাঠিয়েছি। আপনারা তো জানেন পুলিশের খাওয়া-দাওয়ারও কোনো টাইম নেই। খাওয়া-দাওয়াটা ঠিকমতো করতে পারি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাড়ে ১০টার সময়ের অভিযোগটি সত্যি নয়, ৮টার পরপরই গিয়েছে।’

