‘মব’ তৈরি করে রামেবি উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হককে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে তারা উপাচার্যের দপ্তরে ঢুকে পড়ে ‘মব’ তৈরি করে। এ সময় উপাচার্যের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে (পিও) মারধর করা হয় এবং উপাচার্যকে টানাহেঁচড়া করে সঙ্গে আনা একটি পদত্যাগপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়।
মবকারীরা কার্যালয় ত্যাগের সময় সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক ও যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যায় বলে জানা গেছে। ঘটনার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই দ্রুত দপ্তর ত্যাগ করেন।
রামেবির প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ১৫-২০ জনের একটি দল মিছিল নিয়ে উপাচার্যের দপ্তরের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় তারা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। স্লোগান দিতে দিতে দলটির সদস্যরা জোরপূর্বক উপাচার্যের দপ্তরে প্রবেশ করেন। এরপর উপাচার্যের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নাজমুল হোসাইনকে মারধর করে দপ্তর থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করা হয়।
কর্মকর্তারা আরও জানান, অবরুদ্ধকারীরা উপাচার্যকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে প্রাণনাশের হুমকি দেন। কয়েকজন তার চেয়ার ধরে ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। একপর্যায়ে তাদের তৈরি করে আনা একটি পদত্যাগপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে উপাচার্যকে টেনেহিঁচড়ে দপ্তরের বাইরে নিয়ে আসা হলে তিনি নিচে অবস্থানরত এক কর্মকর্তার মোটরসাইকেলে উঠে দ্রুত রামেবি কার্যালয় ত্যাগ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কার্যালয় ত্যাগের সময় উপাচার্যকে অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। মবকারীরা পরে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নাজমুল হোসাইনকেও পদত্যাগে বাধ্য করেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লেখা পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা হয়— ‘২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর থেকে আমি রামেবির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। বর্তমানে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে আমার পক্ষে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করা আর সম্ভব হচ্ছে না। বিধায় অদ্য ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আমি পদত্যাগ করলাম। আপনি পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করে বাধিত করবেন।’
এদিকে ঘটনার পর ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই দ্রুত অফিস ছেড়ে চলে যান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হলেও তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
লাঞ্ছিত হওয়া ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নাজমুল হোসাইন বলেন, সিসিটিভির হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাসংক্রান্ত ফুটেজ তাদের কবজায় চলে গেছে। এখনো কোনো মামলা করা হয়নি, তবে বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে নির্দেশনা এলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পদত্যাগে বাধ্য হওয়া উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হক বলেন, তারা এর আগেও কয়েকবার এসে আমাকে পদত্যাগের চাপ দিয়েছিল। এবার নিজেরাই একটি পদত্যাগপত্র তৈরি করে নিয়ে আসে। তাতে কী লেখা ছিল, তা পড়ার সুযোগ ও মানসিক অবস্থা আমার ছিল না। জোরপূর্বক তারা স্বাক্ষর নিয়েছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অবহিত করেছি।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হককে চার বছরের জন্য রামেবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই সরকার সমর্থক চিকিৎসকদের একাধিক গ্রুপ ও বিভিন্ন পক্ষ থেকে তাকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। গত আগস্টেও এক দফা তাকে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল; অবশেষে মঙ্গলবার মব তৈরি করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হলো।
