ঠাকুরগাঁওয়ে দেশের প্রথম নদী গ্যালারি, এক ছাদের নিচে ৩৯৮ নদীর স্মৃতি
Advertisement
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১০ পিএম
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে প্রতিদিন এখানে ভিড় করছেন শিক্ষার্থী, গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীরা।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা থেকে সুদূর লন্ডনের টেমস নদী কিংবা বঙ্গোপসাগর—বিভিন্ন নদ-নদী ও সাগরের পানি এবং বালু সংরক্ষণ করা হয়েছে এক ছাদের নিচে। ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব আকচা গ্রামে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এই ‘নদী গ্যালারি’।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত গ্যালারিটি ইতিমধ্যে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সম্প্রতি এটি পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও।
জেলা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে শান্ত পরিবেশে অবস্থিত ‘লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘর’। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ নদী গ্যালারি।
জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে প্রাচীন কৃষিসামগ্রী, শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র, মাদল, সানাই, একতারা ও দোতারাসহ নানা বাদ্যযন্ত্র। পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলের হাতে লেখা দলিল, চিঠিপত্র, পুঁথি এবং জমিদারদের খাজনা আদায়ের রসিদও রয়েছে এখানে।
জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. শহীদ উজ জামান জানান, নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা, ইতিহাস ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এখানে বাংলাদেশের ৩২টি জেলার ৩৯৮টি নদ-নদী, যুক্তরাজ্যের টেমস নদী এবং সাতটি সাগরের পানি ও বালু কাচের জারে সংরক্ষণ করে প্রদর্শন করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে তৃণমূল লোকজ গ্যালারি হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে জাদুঘরটির পরিসর বেড়েছে। এখানে নদী গ্যালারির পাশাপাশি রয়েছে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিবিষয়ক গ্যালারি এবং মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি। এ ছাড়া প্রাঙ্গণে রয়েছে প্রায় ৭০ ধরনের ফলের গাছ ও ১২০ ধরনের ঔষধি গাছ।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে প্রতিদিন এখানে ভিড় করছেন শিক্ষার্থী, গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীরা।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে গ্যালারিটি পরিদর্শনে আসে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার ও শাফিন ইসলাম। লামিয়া বলে, পাঠ্যপুস্তকে যা পড়েছি, এখানে এসে তার বাস্তব রূপ দেখলাম। এটি আমাদের কাছে একটি জীবন্ত পাঠশালা।
শাফিন বলে, শুধু নদ-নদী নয়, এখানকার আদি মানুষের জীবনযাত্রা, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য সামগ্রী, প্রাচীন পালকি ও গরুর গাড়ি আধুনিক প্রজন্মের সঙ্গে অতীতের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
গ্যালারিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন গবেষক ও বিশিষ্টজনেরাও। ঠাকুরগাঁও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, দেশে এ ধরনের জাদুঘর এটিই প্রথম। এটি নদী গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, দেশের অন্য কোথাও এমন নদী গ্যালারি নেই। নিজে পরিদর্শনে গিয়ে অভিভূত হয়েছি।
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সংস্কৃতিব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে দেশের নদীগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বাঙালির সভ্যতা ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নদী রক্ষা জরুরি। নদী গ্যালারি সেই সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
‘নদী বাঁচলে বাঁচবে প্রকৃতি’—এই বার্তাকে সামনে রেখে নদী, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরছে গ্যালারিটি।

