৬ লাখে রাশিয়ায়, ৩০ লাখে যুদ্ধে— ফিরল সাগরের মৃত্যুর সংবাদ
Advertisement
চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩১ এএম
নিহত সাগর। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন ছিল সাগরের। পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। কিশোর বয়সেই পরিবারের হাল ধরতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন ভ্যানের হ্যান্ডেল। দিনভর ভ্যান চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত সংসার। সেই সাগরই একদিন ভাগ্যবদলের আশায় পাড়ি জমিয়েছিলেন রাশিয়ায়। কিন্তু ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে এক বাংলাদেশি দালালের প্রলোভনে জড়িয়ে পড়েন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অবশেষে আসে সেই দুঃসংবাদ- সাগর আর নেই!
২৪ বছর বয়সি সাগরের মৃত্যুর খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে তার পরিবার। ছেলের শোকে মূর্ছা গেছেন মা। আর অসুস্থ বাবা কবির হোসেনের মুখে এখন শুধু হাহাকার। ধারদেনা করে যে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন পরিবারের অভাব ঘোচানোর আশায়, সেই ছেলের আর দেশে ফেরা হলো না।
সাগর কুমিল্লার চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার মো. কবির হোসেনের ছেলে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
জানা যায়, চান্দিনা উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে নিয়মিত ভ্যান চালাতেন সাগর। সেই সুবাদে দোকানটির এক ম্যানেজারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে ওই ম্যানেজার চাকরি ছেড়ে বিদেশে চলে গেলেও তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়নি।
কয়েক বছর পর দেশে ফিরে ওই ম্যানেজার আবারও একই দোকানে চাকরি নেন। পুরোনো সম্পর্কের সূত্র ধরে সাগরকে বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের মাঝামাঝি মাত্র ৬ লাখ টাকা খরচে রাশিয়ায় পাড়ি জমান সাগর।
রাশিয়ায় গিয়ে একটি বেকারিতে কাজ নেন সাগর। মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা বেতনও পাচ্ছিলেন। দেশের অভাবী পরিবারের জন্য এই আয় ছিল বড় ভরসা। কিন্তু সেখানে কাজ করার সময় পরিচয় হয় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ওই দালাল সাগরকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি এককালীন ৩০ লাখ টাকা পাওয়ার প্রলোভন দেখান। সেই প্রলোভনে পড়ে চলতি বছরের মে মাসে বেকারির চাকরি ছেড়ে দেন সাগর। এরপর জড়িয়ে পড়েন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে।
যুদ্ধে যাওয়ার পর থেকেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগে দিন কাটছিল স্বজনদের।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাশিয়া থেকে সাগরের এক বন্ধু তার বোনের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠান। বার্তায় লেখা ছিল, ‘সাগর আর নেই’।
এই একটি বার্তাই যেন মুহূর্তে তছনছ করে দেয় পরিবারটির সব আশা। খবরটি শোনার পর সাগরের মা মূর্ছা যান। বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। তবে কীভাবে, কোথায় এবং কখন সাগরের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানতে পারেনি পরিবার।
সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল জানান, রাশিয়ার বেকারির চাকরি ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা সাগর তাকে জানিয়েছিলেন। তখন তিনি তাকে নিষেধ করেছিলেন।
আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘সাগর যখন রাশিয়ার বেকারিতে চাকরি ছেড়ে সেনাবাহিনীতে চাকরির কথা আমাকে জানায়, তখন আমি তাকে বারণ করেছিলাম। কারণ, সাগর লেখাপড়াই জানে না। সে বিদেশে সেনাবাহিনীতে চাকরি করবে কীভাবে? ওই দেশের দালাল তাকে ভুল তথ্য দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যুক্ত করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাগর যুদ্ধে যাওয়ার আগে আমার অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকাও পাঠায়। তারপর আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। শনিবার তার বন্ধু মেসেজ করে জানিয়েছে, সাগর মারা গেছে। রাতে বিস্তারিত জানাবে বলেছিল। কিন্তু রোববার (১৮ অক্টোবর) রাত ৯টা পর্যন্ত ফোন করেনি। আমরাও তাকে ফোনে পাচ্ছি না।’
সাগরের বাবা কবির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। একসময় সবজির ব্যবসা করতেন। অভাবের সংসারে ছেলের আয়ের আশায় ধারদেনা করে তাকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। এখন সেই ছেলের মৃত্যুসংবাদ মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কবির হোসেন বলেন, ‘সবজির ব্যবসা করেছি। দীর্ঘদিন নানা রোগে অসুস্থ। অনেক ধারদেনা করে তাকে বিদেশ পাঠিয়েছি। প্রায় চার-পাঁচ মাস যাবৎ ছেলেটার সঙ্গে কথাও বলতে পারিনি। এখন শুনি, আমার ছেলে আর নেই।’
কথা বলতে বলতে একসময় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। পরিবারের সচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া ছেলের এমন পরিণতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা।
এদিকে সাগরের মৃত্যুর খবর ও তার মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি পরিবার। স্বজনেরা রাশিয়ায় থাকা তার বন্ধুর কাছ থেকে বিস্তারিত জানার অপেক্ষায় রয়েছেন।
চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব।’

